উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদরোগ: কখন সতর্ক হওয়া জরুরি?
উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কোন রক্তচাপের মাত্রায় সতর্ক হবেন এবং কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন জানুন।
উচ্চ রক্তচাপ কেন হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়?
উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন এমন একটি স্বাস্থ্যসমস্যা, যা অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই বছরের পর বছর শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই উচ্চ রক্তচাপকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা না করলে অনেকেই জানতেই পারেন না যে তাদের রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।
দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃদপিণ্ডকে রক্ত সঞ্চালনের জন্য বেশি চাপের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়। একই সঙ্গে রক্তনালির ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ে। সময়ের সঙ্গে রক্তনালি শক্ত ও সংকুচিত হতে পারে এবং ধমনিতে চর্বি বা প্লাক জমার প্রক্রিয়া বাড়তে পারে। এসব পরিবর্তন হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কোন রক্তচাপকে উচ্চ রক্তচাপ বলা হয়?
American Heart Association-এর বর্তমান শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সিস্টোলিক রক্তচাপ ১৩০–১৩৯ mmHg অথবা ডায়াস্টোলিক ৮০–৮৯ mmHg হলে তা স্টেজ ১ হাইপারটেনশনের মধ্যে পড়ে। সিস্টোলিক ১৪০ mmHg বা তার বেশি অথবা ডায়াস্টোলিক ৯০ mmHg বা তার বেশি হলে স্টেজ ২ হাইপারটেনশন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে একটি মাত্র রক্তচাপের মাপ দিয়ে উচ্চ রক্তচাপের চূড়ান্ত রোগনির্ণয় করা হয় না; ধারাবাহিক পরিমাপ ও চিকিৎসকের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা ব্যক্তির বয়স, অন্যান্য রোগ এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে।
উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদরোগ কীভাবে হতে পারে?
১. হৃদপিণ্ডের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে
রক্তচাপ দীর্ঘদিন বেশি থাকলে হৃদপিণ্ডকে রক্ত পাম্প করার জন্য বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। এর ফলে হৃদপেশিতে পরিবর্তন আসতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
২. ধমনিতে ক্ষতি হতে পারে
অতিরিক্ত চাপ রক্তনালির দেয়ালে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ধমনিতে প্লাক জমে রক্তনালি সরু হয়ে গেলে হৃদপেশিতে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ কমে যেতে পারে। এই প্রক্রিয়া করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৩. হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়তে পারে
উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ধমনিতে প্লাক জমা ও রক্তনালির সংকোচনের মতো পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কোনো ধমনি গুরুতরভাবে বন্ধ হয়ে গেলে হৃদপেশিতে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
৪. স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে
উচ্চ রক্তচাপ শুধু হৃদপিণ্ডের জন্য নয়, মস্তিষ্কের রক্তনালির জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা হৃদরোগের পাশাপাশি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
কখন সতর্ক হওয়া জরুরি?
উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অনেক সময় কোনো উপসর্গ থাকে না। তাই মাথাব্যথা বা মাথা ঘোরা না হওয়া মানেই রক্তচাপ স্বাভাবিক, এমন ধারণা ঠিক নয়। নিয়মিত রক্তচাপ মাপাই উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
বিশেষ করে বারবার রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। নিজের ইচ্ছায় ওষুধ শুরু, বন্ধ বা ডোজ পরিবর্তন করা উচিত নয়।
রক্তচাপ ১৮০/১২০ mmHg-এর বেশি হলে কী করবেন?
সিস্টোলিক রক্তচাপ ১৮০ mmHg-এর বেশি অথবা ডায়াস্টোলিক ১২০ mmHg-এর বেশি হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। এমন রিডিং পেলে অন্তত এক মিনিট অপেক্ষা করে আবার রক্তচাপ মাপার পরামর্শ দেওয়া হয়। দ্বিতীয়বারও রক্তচাপ এত বেশি থাকলে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন।
আর যদি একই সঙ্গে বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, পিঠে ব্যথা, অসাড়তা, দুর্বলতা, দৃষ্টির পরিবর্তন বা কথা বলতে অসুবিধার মতো উপসর্গ থাকে, তাহলে এটি জরুরি চিকিৎসার পরিস্থিতি হতে পারে। এ অবস্থায় অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া উচিত।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কী করবেন?
- নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ করুন এবং রিডিং লিখে রাখুন।
- খাবারে অতিরিক্ত লবণ কমান এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
- নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের অভ্যাস করুন।
- অতিরিক্ত ওজন থাকলে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন।
- ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য এড়িয়ে চলুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপের ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ করুন।
- নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করবেন না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কম লবণযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাদ্য, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং তামাক বর্জনের মতো জীবনযাপনগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেয়।
শুধু ওষুধ খেলেই কি ঝুঁকি কমে?
উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও বজায় রাখা দরকার। কারও ক্ষেত্রে জীবনযাপনের পরিবর্তনের পাশাপাশি ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে। আবার কারও চিকিৎসা পরিকল্পনা অন্য রোগ বা হৃদ্রোগের ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে।
তাই পরিবারের কারও প্রেসক্রিপশন দেখে নিজের জন্য একই ওষুধ ব্যবহার করা বা রক্তচাপ কমে গেলে হঠাৎ ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া নিরাপদ নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই হৃদপিণ্ড ও রক্তনালির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু অসুস্থ বোধ করার সময় নয়, নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করাও হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বারবার রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখার মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
বিশেষ করে অত্যন্ত বেশি রক্তচাপের সঙ্গে বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা, অসাড়তা, দৃষ্টির পরিবর্তন বা কথা বলায় সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0