দীর্ঘসময় স্ক্রিন দেখলে চোখে কী হয়? ডিজিটাল আই স্ট্রেনের লক্ষণ
দীর্ঘসময় মোবাইল, কম্পিউটার বা ট্যাব ব্যবহার করলে চোখে শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া, ঝাপসা দেখা ও মাথাব্যথা হতে পারে। জানুন ডিজিটাল আই স্ট্রেনের লক্ষণ ও প্রতিরোধ।
দীর্ঘসময় স্ক্রিন দেখলে চোখে কী হয়?
স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাব ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস এখন পড়াশোনা, অফিসের কাজ, যোগাযোগ ও বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে দিনের বড় একটি সময় স্ক্রিনের সামনে কাটানো অনেকের জন্যই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু একটানা দীর্ঘসময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে অস্বস্তি, ক্লান্তি, শুষ্কতা ও সাময়িক দৃষ্টির সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই সমস্যাগুলোকে সাধারণভাবে ডিজিটাল আই স্ট্রেন বা কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম বলা হয়।
আমেরিকান অপটোমেট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘসময় কম্পিউটার, ট্যাবলেট, ই-রিডার বা মোবাইল ব্যবহারের সঙ্গে চোখ ও দৃষ্টিসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। একটানা স্ক্রিন ব্যবহারের সময় যত বাড়ে, অস্বস্তির মাত্রাও তত বাড়তে পারে।
ডিজিটাল আই স্ট্রেন কেন হয়?
স্ক্রিন দেখার সময় চোখকে কাছের একটি বস্তুতে দীর্ঘক্ষণ ফোকাস করে রাখতে হয়। একই সঙ্গে চোখের নড়াচড়া ও দুই চোখের সমন্বয়ও দীর্ঘসময় সক্রিয় থাকে। স্ক্রিনের ঝলক, অতিরিক্ত বা অপর্যাপ্ত আলো, ভুল দূরত্ব এবং ভুল বসার ভঙ্গি এই চাপ আরও বাড়াতে পারে। আগে থেকেই চশমার প্রয়োজন থাকা কিন্তু সঠিক পাওয়ার ব্যবহার না করলেও সমস্যা বেশি অনুভূত হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো চোখের পলক ফেলার হার কমে যাওয়া। সাধারণ অবস্থায় মানুষ প্রতি মিনিটে প্রায় ১৫ বার বা তার বেশি পলক ফেলতে পারে। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকলে পলক ফেলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। ফলে চোখের পৃষ্ঠে অশ্রুর স্তর দ্রুত শুকিয়ে গিয়ে শুষ্কতা ও জ্বালাপোড়া তৈরি হতে পারে।
ডিজিটাল আই স্ট্রেনের সাধারণ লক্ষণ
দীর্ঘসময় স্ক্রিন ব্যবহারের পর নিচের এক বা একাধিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে:
- চোখে ক্লান্তি বা চাপ অনুভূত হওয়া
- চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া
- চোখে জ্বালাপোড়া বা খসখসে অনুভূতি
- চোখ লাল হওয়া বা অস্বস্তি
- চোখ দিয়ে অতিরিক্ত পানি পড়া
- ঝাপসা দেখা
- কখনও কখনও দ্বৈত দেখা
- চোখের চারপাশে ব্যথা বা ভারী লাগা
- মাথাব্যথা
- ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা
এসব উপসর্গ সাধারণত সাময়িক এবং স্ক্রিন থেকে বিরতি নেওয়ার পর কমে যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিন একই সমস্যা বারবার হলে এর পেছনে চোখের পাওয়ারের সমস্যা, শুষ্ক চোখ বা অন্য কোনো চোখের রোগ রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
স্ক্রিন দেখলে চোখ শুকিয়ে যায় কেন?
চোখের সুস্থতার জন্য চোখের ওপর অশ্রুর একটি পাতলা স্তর থাকা প্রয়োজন। এটি চোখকে আর্দ্র রাখে এবং চোখের পৃষ্ঠকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু দীর্ঘসময় স্ক্রিন দেখার সময় মানুষ সাধারণত কম পলক ফেলে। ফলে চোখের পৃষ্ঠে অশ্রুর স্তর ঠিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে না পারায় শুষ্কতা ও অস্বস্তি বাড়তে পারে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা অতিরিক্ত শুষ্ক পরিবেশ, ধুলাবালি এবং কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারের মতো বিষয়ও স্ক্রিন-সম্পর্কিত চোখের শুষ্কতা বাড়াতে পারে।
দীর্ঘসময় স্ক্রিন দেখা কি চোখ স্থায়ীভাবে নষ্ট করে?
দীর্ঘসময় স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে যে ডিজিটাল আই স্ট্রেন হয়, তা সাধারণত সাময়িক অস্বস্তির কারণ। আমেরিকান একাডেমি অব অপথালমোলজির তথ্য অনুযায়ী, কম্পিউটার বা অন্যান্য ডিজিটাল স্ক্রিন সরাসরি চোখের স্থায়ী ক্ষতি করে—এমন প্রমাণ নেই। তবে দীর্ঘসময় বিরতি ছাড়া স্ক্রিন ব্যবহার করলে চোখে চাপ ও শুষ্কতার মতো সমস্যা হতে পারে।
এখানে নীল আলোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল স্ক্রিনের নীল আলো চোখের রেটিনাকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে বা অন্ধত্ব ঘটায়—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বর্তমানে নেই। তবে সন্ধ্যা বা রাতে অতিরিক্ত নীল আলোর সংস্পর্শ শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে।
চোখ ভালো রাখতে ২০-২০-২০ নিয়ম
ডিজিটাল আই স্ট্রেন কমানোর একটি সহজ উপায় হলো ২০-২০-২০ নিয়ম অনুসরণ করা। অর্থাৎ, প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন দেখার পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকাতে হবে। এতে কাছের কাজে দীর্ঘসময় ফোকাস করে থাকা চোখকে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়া যায়।
এ ছাড়া কাজের সময় নিয়মিত পলক ফেলার কথা মনে রাখা এবং চোখ শুষ্ক লাগলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে কৃত্রিম অশ্রু ব্যবহার করা যেতে পারে।
স্ক্রিন ব্যবহারের সময় আর কী কী সতর্কতা জরুরি?
স্ক্রিনের দূরত্ব ঠিক রাখুন
কম্পিউটার স্ক্রিন চোখের একেবারে কাছে না রেখে প্রায় এক হাত দূরত্বে রাখা এবং স্ক্রিন এমনভাবে স্থাপন করা ভালো যাতে চোখ সামান্য নিচের দিকে থাকে। এতে চোখ ও ঘাড়ের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
আলো ও ঝলক নিয়ন্ত্রণ করুন
ঘরের আলো খুব বেশি বা খুব কম হওয়া এবং স্ক্রিনে বাইরের আলোর প্রতিফলন চোখের অস্বস্তি বাড়াতে পারে। তাই স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা এবং অতিরিক্ত ঝলক কমানোর চেষ্টা করা উচিত।
একটানা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকবেন না
কাজ বা পড়াশোনার প্রয়োজনে স্ক্রিন ব্যবহার করতেই হলে দীর্ঘসময় একটানা না দেখে নিয়মিত ছোট বিরতি নেওয়া ভালো। বিরতির সময় শুধু অন্য একটি স্ক্রিনে না তাকিয়ে দূরের কোনো বস্তু দেখা বা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রাখা বেশি উপকারী হতে পারে।
রাতে স্ক্রিন ব্যবহারে সতর্ক থাকুন
ঘুমানোর আগে দীর্ঘসময় ফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করলে স্ক্রিনের আলো ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। সন্ধ্যার পর স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা কমানো বা নাইট মোড ব্যবহার করা যেতে পারে। আরও ভালো ঘুমের জন্য ঘুমানোর আগে কিছু সময় স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা উপকারী।
শিশুদের ক্ষেত্রে কী করবেন?
শিশুদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘসময় স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে চোখের অস্বস্তি, শুষ্কতা বা চোখে চাপের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘসময় ঘরের ভেতরে থেকে স্ক্রিন দেখার পরিবর্তে বাইরে শারীরিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার সুযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের দৃষ্টির সমস্যা নিয়ে সন্দেহ থাকলে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো উচিত।
বিশেষ করে শিশু যদি খুব কাছে গিয়ে স্ক্রিন দেখে, বারবার চোখ কচলায়, চোখে ব্যথার কথা বলে, মাথাব্যথা করে বা দূরের জিনিস দেখতে সমস্যা হয়, তাহলে চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
স্ক্রিন থেকে বিরতি নেওয়ার পরও যদি ঝাপসা দেখা, চোখে ব্যথা, অতিরিক্ত শুষ্কতা বা অন্য কোনো দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যা থেকে যায়, তাহলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে সমস্যা যদি বারবার ফিরে আসে বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তাহলে শুধু স্ক্রিনের ক্লান্তি ধরে না নিয়ে চোখ পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, তীব্র চোখব্যথা, চোখে গুরুতর আঘাত, আলোর ঝলক বা দৃষ্টিক্ষেত্রে হঠাৎ নতুন কালো দাগের মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত। এগুলো সাধারণ ডিজিটাল আই স্ট্রেনের বৈশিষ্ট্য নয়।
শেষ কথা
ডিজিটাল ডিভাইস আধুনিক জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ হলেও একটানা দীর্ঘসময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। কম পলক ফেলা, দীর্ঘসময় কাছের কাজে ফোকাস করা, অতিরিক্ত ঝলক, ভুল দূরত্ব ও অপর্যাপ্ত বিরতির কারণে চোখ শুষ্ক, ক্লান্ত ও ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা হতে পারে।
তাই নিয়মিত বিরতি নেওয়া, ২০-২০-২০ নিয়ম মেনে চলা, পর্যাপ্ত পলক ফেলা, স্ক্রিনের দূরত্ব ও আলো ঠিক রাখা এবং প্রয়োজন হলে চোখ পরীক্ষা করানো—এসব অভ্যাস ডিজিটাল আই স্ট্রেন কমাতে সাহায্য করতে পারে।
স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করা নয়, বরং চোখের জন্য সঠিকভাবে ও বিরতি নিয়ে স্ক্রিন ব্যবহার করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0