শিশুর ওজন বেশি হলেই কি সে বেশি সুস্থ? জানুন প্রকৃত তথ্য
শিশুর ওজন বেশি হলেই সে সুস্থ—এ ধারণা সঠিক নয়। শিশুর বয়স, উচ্চতা, পুষ্টি, শারীরিক সক্রিয়তা ও বৃদ্ধির ধারা কীভাবে তার স্বাস্থ্য নির্ধারণ করে, জেনে নিন।
শিশুর ওজন বেশি হলেই কি সে বেশি সুস্থ? জানুন প্রকৃত তথ্য
শিশু একটু গোলগাল হলে অনেকেই মনে করেন, সে নিশ্চয়ই ভালো খায়, তাই বেশি সুস্থ। পরিবারের সদস্য কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও প্রায়ই শোনা যায়—শিশুর ওজন বাড়ছে মানেই তার শরীর ভালো হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ধারণা সবসময় সঠিক নয়। শিশুর সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে তার বয়স অনুযায়ী বৃদ্ধি, উচ্চতা, পুষ্টির অবস্থা, শারীরিক সক্রিয়তা, ঘুম এবং সামগ্রিক সুস্থতার ওপর। শুধু ওজন দেখে শিশুর স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
শিশুর ওজন বেশি মানেই কি পুষ্টি ভালো?
শিশুর ওজন বাড়া স্বাভাবিক বৃদ্ধির একটি অংশ। তবে ওজন বাড়ার পাশাপাশি তার উচ্চতা ও অন্যান্য শারীরিক বিকাশও বয়স অনুযায়ী হচ্ছে কি না, তা দেখা জরুরি। কোনো শিশু বেশি ওজনের হলেও তার শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ বা অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকতে পারে। একইভাবে, তুলনামূলক কম ওজনের কোনো শিশু স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠতে পারে।
অতিরিক্ত ওজন ও অপুষ্টি একে অপরের বিপরীত—এমন ধারণাও সঠিক নয়। অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসবজি, প্রোটিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলে শিশুর খাদ্যাভ্যাস ভারসাম্যহীন হতে পারে। তাই শিশুর শরীরের আকারের চেয়ে তার খাবারের গুণগত মান এবং বৃদ্ধির ধারাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শিশুর অতিরিক্ত ওজন কেন উদ্বেগের কারণ হতে পারে?
শৈশবে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা থাকলে পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শৈশব ও কৈশোরের স্থূলতা টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। (সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা)
অতিরিক্ত ওজনের পেছনে শুধু বেশি খাওয়াই দায়ী নয়। জিনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবারের খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ, ঘুম, পরিবেশ এবং অন্যান্য জৈবিক ও সামাজিক বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই শিশুর ওজন বাড়লে তাকে দোষারোপ করা বা লজ্জা দেওয়া উচিত নয়; বরং কারণ বুঝে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করা প্রয়োজন।
কীভাবে বুঝবেন শিশুর ওজন স্বাভাবিক কি না?
শিশুর ওজন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বয়স, উচ্চতা এবং লিঙ্গ অনুযায়ী নির্ধারিত বৃদ্ধির চার্ট ব্যবহার করা হয়। দুই বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই (BMI) এবং বয়সভিত্তিক বিএমআই পারসেন্টাইল বিবেচনা করতে পারেন। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৃদ্ধি-মানদণ্ড অনুযায়ী ওজনের সঙ্গে উচ্চতা বা দৈর্ঘ্যের সম্পর্কসহ অন্যান্য মাপ মূল্যায়ন করা হয়।
তবে বিএমআই বা কোনো একটি মাপ একা রোগ নির্ণয় করে না। শিশুর আগের ও বর্তমান বৃদ্ধির ধারা, শারীরিক পরীক্ষা, খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়। এ কারণে শিশুর ওজন নিয়ে উদ্বেগ থাকলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে ভালো।
শিশুর স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে অভিভাবকদের করণীয়
- ভারসাম্যপূর্ণ খাবার দিন: শিশুর বয়স অনুযায়ী ভাত বা অন্যান্য শস্য, ডাল, ডিম, মাছ, মাংস, শাকসবজি ও ফলের সমন্বয়ে খাবার দিন।
- চিনিযুক্ত পানীয় কমান: কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি দেওয়া শরবত ও প্যাকেটজাত মিষ্টি পানীয়ের পরিবর্তে নিরাপদ পানি দিন।
- খাবার নিয়ে চাপ সৃষ্টি করবেন না: জোর করে অতিরিক্ত খাওয়ানো বা খাবার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া—দুটিই এড়িয়ে চলুন। শিশুর বয়স, ক্ষুধা ও পুষ্টির প্রয়োজন বিবেচনা করুন।
- খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করুন: বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটা, দৌড়ানো, খেলাধুলা এবং অন্যান্য আনন্দদায়ক শারীরিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিন।
- ঘুমের নিয়ম ঠিক রাখুন: শিশুর বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- স্ক্রিনের সময় নিয়ন্ত্রণ করুন: দীর্ঘ সময় মোবাইল বা টিভি দেখার পরিবর্তে খেলাধুলা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং সক্রিয় বিনোদনে উৎসাহ দিন।
- পরিবারের সবাই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস অনুসরণ করুন: শিশুকে আলাদা করে খাবার নিয়ন্ত্রণে বাধ্য না করে পরিবারের সবার খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন রুটিন উন্নত করুন।
শিশুর ওজন বেশি হলে কি ডায়েট করানো উচিত?
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শিশুকে ওজন কমানোর কঠোর ডায়েট করানো, খাবারের পরিমাণ হঠাৎ কমিয়ে দেওয়া কিংবা ওজন কমানোর ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট দেওয়া উচিত নয়। বেড়ে ওঠার সময় শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত শক্তি ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি দরকার। তাই ওজন নিয়ে উদ্বেগ থাকলে প্রথমে তার বৃদ্ধি ও পুষ্টির অবস্থা মূল্যায়ন করানো উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদ শিশুর জন্য উপযুক্ত পরিকল্পনা দিতে পারেন।
শিশুর ওজন দ্রুত বেড়ে গেলে, উচ্চতা অনুযায়ী ওজন নিয়ে উদ্বেগ থাকলে, স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে সমস্যা দেখা দিলে অথবা খাবার ও বৃদ্ধির বিষয়ে অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শিশুর ওজন কমানোর পরিবর্তে তার স্বাস্থ্যকর বৃদ্ধি ও সামগ্রিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিন।
শেষ কথা
শিশু মোটা হলেই বেশি সুস্থ, আর রোগা হলেই অসুস্থ—এই দুই ধারণাই ভুল। সুস্থ শিশুর পরিচয় শুধু তার ওজন বা শরীরের গড়নে নয়; বরং বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত পুষ্টি, সক্রিয় জীবনযাপন এবং সামগ্রিক সুস্থতায়। তাই শিশুকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে তার নিজস্ব বৃদ্ধির ধারা পর্যবেক্ষণ করুন এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত খেলাধুলার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
স্বাস্থ্য-পরামর্শ: এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার জন্য। শিশুর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য, পুষ্টি বা ওজন মূল্যায়নের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করবেন না।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0