বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ, টিকাদানে ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে হামের বিস্তার ও শিশু মৃত্যুর ঘটনায় আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। টিকাদানের ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে বাধা এবং বাদ পড়া শিশুদের সুরক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

অক্টো 17, 2026 - 14:29
 0  2
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ, টিকাদানে ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ, টিকাদানে ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব এবং শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, সময়মতো টিকা না পাওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবার আওতার বাইরে থেকে যাওয়া শিশুদের কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিস্থিতি মোকাবিলায় টিকাদান কার্যক্রম জোরদার এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

১৭ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যের বরাতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের ৯ তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ ২ হাজার সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২২ হাজার রোগীর সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৪৭ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সংখ্যা নির্দিষ্ট সময়সীমার প্রতিবেদনভিত্তিক; পরবর্তী হালনাগাদে পরিসংখ্যান পরিবর্তিত হতে পারে।

কেন বাংলাদেশের হামের পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করছে?

হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি ও শ্বাসতন্ত্রের নিঃসৃত কণার মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে। পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশু টিকার আওতায় না থাকলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল ব্যক্তিদের গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বেশি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ২০২৫ সালে ব্যাহত হওয়ার পর টিকা গ্রহণের হার কমে যায়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অস্থিরতা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, দুর্বল তথ্যব্যবস্থা এবং দুর্গম বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে না পারা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ হলো, নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি তৈরি হলে শুধু একটি দেশ নয়, অন্যান্য দেশেও টিকাপ্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

টিকাদানে ঘাটতি কেন বড় চ্যালেঞ্জ?

হাম প্রতিরোধে টিকা অত্যন্ত কার্যকর। তবে একটি শিশুর টিকা নেওয়ার কথা থাকলেও সে যদি নির্ধারিত সময়ে টিকা না পায়, তাহলে তার সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। কোনো এলাকায় অনেক শিশু টিকাবঞ্চিত থাকলে সেখানে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। এ কারণেই নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনিসেফের বাংলাদেশবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে হামের দ্বিতীয় ডোজের টিকাদান কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে কমে ৮০ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্যে বিপুলসংখ্যক শিশুর টিকাদানের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। হাম প্রতিরোধে দুই ডোজ টিকার উচ্চ কভারেজ অর্জন এবং তা বজায় রাখা জরুরি।

এখানে শুধু টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। কোন শিশু টিকা পায়নি, কার দ্বিতীয় ডোজ বাকি, কোন এলাকায় টিকাদানের হার কম এবং কোন পরিবার স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিচ্ছিন্ন—এসব তথ্য নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের আস্থা তৈরি, টিকাদানকেন্দ্রে সহজ প্রবেশাধিকার এবং নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

হাম মোকাবিলায় কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সসহ অংশীদারদের সহায়তায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল টিকা না পাওয়া এবং সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া। মে মাসে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।

এ ছাড়া ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) ও টিকাপ্রতিরোধযোগ্য রোগের নজরদারি ব্যবস্থা মূল্যায়নে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা শুরু হওয়ার কথা জানায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। পর্যালোচনায় টিকাদানের আওতা, টিকার সরবরাহ ও সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যকর্মীর সক্ষমতা, রোগ শনাক্তকরণ, তথ্যের মান এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার প্রস্তুতি যাচাই করার পরিকল্পনা রয়েছে। <

রয়টার্সের ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে টিকা না পাওয়া প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে নতুন একটি টিকাদান উদ্যোগ শুরু হয়েছে। তবে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা, জনবলসংকট মোকাবিলা এবং প্রত্যন্ত এলাকার পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। <

শিশুদের হামের লক্ষণ কী কী?

হামের প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়া। কয়েক দিন পর মুখ থেকে শুরু হয়ে শরীরের অন্যান্য অংশে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মুখের ভেতর ছোট সাদা দাগও দেখা যায়। তবে শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে হাম নির্ণয় করা যায় না; প্রয়োজনে চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও পরীক্ষা প্রয়োজন হয়।

হামের জটিলতার মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা এবং মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো গুরুতর সমস্যা রয়েছে। শিশু খুব দুর্বল হয়ে পড়লে, শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, খেতে বা পান করতে না পারলে, খিঁচুনি হলে কিংবা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। শিশু আক্রান্ত হলে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাও জরুরি।

অভিভাবকদের এখন কী করা উচিত?

  • টিকার কার্ড যাচাই করুন: শিশুর বয়স অনুযায়ী হামের টিকার নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করুন।
  • স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিন: কোনো ডোজ বাদ পড়লে বা টিকার সময়সূচি নিয়ে সন্দেহ থাকলে নিকটস্থ টিকাদানকেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
  • গুজবে কান দেবেন না: টিকা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যোগ্য চিকিৎসকের তথ্য অনুসরণ করুন।
  • লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসা নিন: শিশুর জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া ও ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং হাসপাতালে যাওয়ার আগে সম্ভব হলে সংক্রমণের সন্দেহের কথা জানিয়ে দিন।
  • সংক্রমণ ছড়ানো কমান: হাম সন্দেহ হলে শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে দূরে রাখুন এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

জরুরি পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত বা বিশেষ ডোজের টিকা প্রয়োজন কি না, তা শিশুর বয়স, আগের টিকার ইতিহাস এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে। নিজে থেকে টিকার সময়সূচি পরিবর্তন না করে অনুমোদিত নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।

টেকসই সমাধানে প্রয়োজন নিয়মিত টিকাদান

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি শিশুর টিকার তথ্য সংরক্ষণ, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করা, পর্যাপ্ত টিকা ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করা এবং সংক্রমণের তথ্য দ্রুত প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, টিকাদানে সামান্য ঘাটতিও সময়ের সঙ্গে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই কোনো শিশুকে টিকাদানের আওতার বাইরে না রাখা, অভিভাবকদের সঠিক তথ্য দেওয়া এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এখন অত্যন্ত জরুরি।

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং ১৭ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদন। রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর হিসাব সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা অনুযায়ী উল্লেখ করা হয়েছে।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখিত দুঃখিত 0
ওয়াউ ওয়াউ 0
admin mediscript (Medi+Script) is dedicated to advancing health awareness, medical education, and community well-being. Our organization serves as a vibrant platform where healthcare knowledge meets daily living, aiming to inspire hope, happiness, and a healthier future for all. Our mission is to empower individuals, families, and communities with reliable, up-to-date medical information and research. We are committed to supporting both the public and healthcare professionals with educational resources that foster informed decision-making and promote wellness. By bridging modern medical science with everyday life, mediscript inspires people to embrace healthier habits, seek new knowledge, and pursue happiness through holistic well-being. Together, we are building a brighter, more hopeful future—one script at a time.