মাড়ি থেকে রক্ত পড়া কি শুধু দাঁতের সমস্যা? যে রোগগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে
মাড়ি থেকে বারবার রক্ত পড়া শুধু মাড়ির রোগের লক্ষণ নয়। ভিটামিনের ঘাটতি, ডায়াবেটিসসহ কিছু শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
মাড়ি থেকে রক্ত পড়া কি শুধু দাঁতের সমস্যা?
দাঁত ব্রাশ করার সময় বা শক্ত খাবার খাওয়ার পর মাড়ি থেকে সামান্য রক্ত পড়াকে অনেকেই সাধারণ বিষয় হিসেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু মাড়ি থেকে বারবার রক্ত পড়া, অল্প স্পর্শেই রক্তপাত হওয়া বা কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই মাড়ি থেকে রক্ত পড়তে থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ এর পেছনে শুধু দাঁত বা মাড়ির স্থানীয় সমস্যা নয়, শরীরের কিছু সাধারণ স্বাস্থ্যগত সমস্যাও ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দাঁতে প্লাক জমা, মাড়িতে প্রদাহ এবং মাড়ির বিভিন্ন রোগ। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুতর কোনো রোগের আশঙ্কা করার প্রয়োজন নেই। বরং রক্তপাতের সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ আছে কি না এবং সমস্যা কতদিন ধরে চলছে—এসব বিষয় বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার সাধারণ কারণ
দাঁত ও মাড়ির যত্ন ঠিকমতো না নিলে দাঁতের চারপাশে প্লাক বা জীবাণুর আস্তরণ জমতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই প্লাক শক্ত হয়ে টারটারে পরিণত হলে মাড়িতে প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। একে সাধারণভাবে জিনজিভাইটিস (Gingivitis) বলা হয়। এ অবস্থায় দাঁত ব্রাশ বা ফ্লস করার সময় মাড়ি থেকে সহজেই রক্ত পড়তে পারে।
সমস্যা দীর্ঘদিন অবহেলা করলে মাড়ির গভীর অংশে সংক্রমণ তৈরি হয়ে পেরিওডোন্টাইটিস (Periodontitis) হতে পারে। এতে মাড়ি ফুলে যাওয়া, মুখে দুর্গন্ধ, দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া এবং মাড়ি সরে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
কোন কোন রোগ বা শারীরিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে?
১. ভিটামিন সি-এর ঘাটতি
ভিটামিন সি শরীরের সংযোজক টিস্যু ও ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দীর্ঘদিন খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি-এর ঘাটতি থাকলে মাড়ি দুর্বল হয়ে রক্তপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে মাড়ি ফুলে যাওয়া, সহজে রক্ত পড়া এবং ক্ষত সারতে দেরি হওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে শুধু মাড়ি থেকে রক্ত পড়লেই ভিটামিন সি-এর ঘাটতি রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে কারণ নির্ণয় করা উচিত।
২. ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিসের সঙ্গে মাড়ির রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে মুখের সংক্রমণ ও মাড়ির সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার গুরুতর মাড়ির রোগ থাকলেও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
তাই মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা ওজনের পরিবর্তনের মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
৩. রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা
শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় সমস্যা থাকলে সামান্য আঘাতেও অতিরিক্ত বা দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাত হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে মাড়ি ছাড়াও নাক দিয়ে বারবার রক্ত পড়া, সহজে কালশিটে পড়া বা ছোট ক্ষত থেকে দীর্ঘসময় রক্ত পড়ার মতো লক্ষণ দেখা যেতে পারে।
এ ধরনের একাধিক উপসর্গ থাকলে শুধু দাঁতের চিকিৎসা না করে চিকিৎসকের মাধ্যমে রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
৪. প্লেটলেট কমে যাওয়া
রক্ত জমাট বাঁধতে প্লেটলেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রক্তে প্লেটলেটের সংখ্যা কমে গেলে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে অস্বাভাবিক রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার পাশাপাশি শরীরে ছোট ছোট লাল বা বেগুনি দাগ, সহজে কালশিটে পড়া বা নাক দিয়ে রক্ত পড়ার মতো লক্ষণ থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
তবে এসব লক্ষণ থাকলেই প্লেটলেট কমে গেছে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। রক্ত পরীক্ষা করে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন।
৫. কিছু ওষুধের প্রভাব
কিছু ওষুধ রক্তপাতের প্রবণতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে রক্ত পাতলা রাখার জন্য ব্যবহৃত কিছু ওষুধ গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে মাড়ি থেকে রক্তপাত তুলনামূলকভাবে বেশি চোখে পড়তে পারে।
তবে এমন ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শে শুরু করা হয়ে থাকলে শুধু মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার কারণে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করা নিরাপদ।
৬. হরমোনের পরিবর্তন
গর্ভাবস্থা, মাসিক চক্র বা জীবনের কিছু পর্যায়ে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মাড়ি প্লাকের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। ফলে মাড়ি ফুলে যাওয়া, স্পর্শে ব্যথা বা দাঁত ব্রাশ করার সময় রক্ত পড়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
এ অবস্থাতেও নিয়মিত মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজন হলে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কখন বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন?
মাঝে মধ্যে শক্তভাবে ব্রাশ করার পর সামান্য রক্ত পড়া এবং দীর্ঘদিন ধরে কোনো কারণ ছাড়াই মাড়ি থেকে রক্ত পড়া—দুটি বিষয় এক নয়। নিচের লক্ষণগুলো থাকলে চিকিৎসকের বা দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো:
- বারবার মাড়ি থেকে রক্ত পড়া
- দাঁত ব্রাশ না করলেও মাড়ি থেকে রক্তপাত হওয়া
- মাড়ি ফুলে যাওয়া বা অতিরিক্ত লাল হয়ে যাওয়া
- মাড়িতে ব্যথা বা পুঁজ হওয়া
- মুখে দীর্ঘস্থায়ী দুর্গন্ধ থাকা
- দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া
- নাক দিয়ে বারবার রক্ত পড়া বা শরীরে সহজে কালশিটে পড়া
- অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা দীর্ঘস্থায়ী জ্বরের মতো অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে রক্তপাত থাকা
মাড়ি থেকে রক্ত পড়লে কী করবেন?
প্রথমেই দাঁত ব্রাশ করা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়। বরং নরম ব্রিসলের টুথব্রাশ দিয়ে আলতোভাবে নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার করতে হবে। দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে অতিরিক্ত জোরে ব্রাশ করলে মাড়িতে আঘাত লাগতে পারে, তাই সঠিক কৌশলে ব্রাশ করা প্রয়োজন।
দাঁতে শক্ত টারটার জমে থাকলে পেশাদার দাঁত পরিষ্কার বা স্কেলিংয়ের প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে দন্ত চিকিৎসক মাড়ির অবস্থা পরীক্ষা করে রক্তপাতের কারণ নির্ণয় করতে পারবেন।
যদি মাড়ির সমস্যার পাশাপাশি শরীরের অন্য কোথাও অস্বাভাবিক রক্তপাত, সহজে কালশিটে পড়া বা অন্য কোনো শারীরিক উপসর্গ থাকে, তাহলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা দিতে পারেন।
নিজে থেকে ভিটামিন বা ওষুধ শুরু করবেন না
মাড়ি থেকে রক্ত পড়লেই আয়রন, ভিটামিন সি বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট নিজের ইচ্ছায় শুরু করা উচিত নয়। কারণ রক্তপাতের কারণ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে মাড়ির প্রদাহই প্রধান কারণ, আবার কারও ক্ষেত্রে ওষুধ, পুষ্টির ঘাটতি বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা জড়িত থাকতে পারে। সঠিক কারণ জানা গেলে চিকিৎসাও আরও কার্যকরভাবে দেওয়া সম্ভব।
মাড়ির সুস্থতায় প্রতিদিনের যত্ন
- দিনে অন্তত দুইবার সঠিক নিয়মে দাঁত ব্রাশ করুন।
- দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার রাখুন।
- অতিরিক্ত মিষ্টি ও দাঁতের জন্য ক্ষতিকর খাবার কমান।
- ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য এড়িয়ে চলুন।
- নিয়মিত দন্ত চিকিৎসকের কাছে মুখ ও মাড়ি পরীক্ষা করান।
- সুষম খাবার খান এবং পর্যাপ্ত ফল ও শাকসবজি রাখুন।
শেষ কথা
মাড়ি থেকে রক্ত পড়া অনেক সময় সাধারণ মাড়ির প্রদাহ বা দাঁতে প্লাক জমার কারণে হলেও সবসময় বিষয়টিকে শুধু দাঁতের সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়। ভিটামিনের ঘাটতি, ডায়াবেটিস, রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা, প্লেটলেটের অস্বাভাবিকতা, কিছু ওষুধ এবং হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষ করে রক্তপাত যদি বারবার হয় বা শরীরের অন্য অংশে অস্বাভাবিক রক্তপাতের লক্ষণও দেখা দেয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
মনে রাখুন: মাড়ি থেকে রক্ত পড়ার কারণ নির্ণয় করাই সঠিক চিকিৎসার প্রথম ধাপ। তাই দীর্ঘদিনের বা অস্বাভাবিক রক্তপাতকে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী দন্ত চিকিৎসক বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0