বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট: চিকিৎসাসেবায় এর প্রভাব কতটা?
বিশ্বজুড়ে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার পথে বড় বাধা। WHO-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালে বিশ্বে ১ কোটি ১০ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি। চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীর পর্যাপ্ত উপস্থিতি ছাড়া একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা, কর্মীদের অসম বণ্টন, প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং পেশা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা—বিভিন্ন কারণে অনেক দেশে এ সংকট তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে রোগীর চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ, অপেক্ষার সময় এবং সেবার মানের ওপর।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) হালনাগাদ হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি হতে পারে। এ ঘাটতির বড় অংশ নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে উচ্চ আয়ের দেশগুলোও কর্মী ধরে রাখা, অবসরজনিত শূন্যপদ এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলে জনবলের অভাবের মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট কেন তৈরি হচ্ছে?
স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। অনেক দেশে চিকিৎসক ও নার্স তৈরির জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাব রয়েছে। আবার প্রশিক্ষণ শেষ করলেও সব স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় কর্মী কম, আবার কোথাও প্রশিক্ষিত কর্মী থাকলেও তাঁদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না।
গ্রাম, প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মী ধরে রাখাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাব, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং পেশাগত উন্নয়নের সীমিত সুযোগের কারণে অনেকে বড় শহর বা অন্য দেশে কাজ করতে আগ্রহী হন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন কিছু দেশে কর্মীর ঘাটতি আরও বাড়াতে পারে।
১. রোগীর চিকিৎসা পেতে দেরি হতে পারে
চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম হলে রোগীর পরামর্শ নেওয়া, পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসা শুরু করার জন্য অপেক্ষা বাড়তে পারে। বিশেষ করে জরুরি বিভাগ, প্রসূতি সেবা, শিশুস্বাস্থ্য এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দেরি সব ক্ষেত্রে একই রকম প্রভাব ফেলে না। তবে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, গুরুতর সংক্রমণ বা প্রসবকালীন জটিলতার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত মূল্যায়ন ও চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি মোকাবিলায় জরুরি বিভাগে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল রাখা বিশেষ প্রয়োজন।
২. চিকিৎসার মান ও রোগীর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে
একজন স্বাস্থ্যকর্মীকে একসঙ্গে অনেক রোগীর দায়িত্ব সামলাতে হলে প্রতিটি রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ, চিকিৎসার নথি যাচাই এবং রোগী বা স্বজনদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলার জন্য পর্যাপ্ত সময় নাও পাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত কাজের চাপ ও ক্লান্তি যোগাযোগের ভুল, চিকিৎসার নির্দেশনা অনুসরণে সমস্যা এবং রোগীর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কম হলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে চিকিৎসার মান খারাপ হবে—এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না। পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, কার্যকর দলগত কাজ, সঠিক রোগী ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তাবিষয়ক প্রটোকলও গুরুত্বপূর্ণ। তবু প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকলে এসব ব্যবস্থা বজায় রাখা আরও কঠিন হতে পারে।
৩. স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক ও শারীরিক চাপ বাড়ে
দীর্ঘ সময় কাজ করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়া এবং একসঙ্গে অনেক রোগীর দায়িত্ব পালন করতে হওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি বাড়াতে পারে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব, সীমিত সহায়তা এবং পেশাগত চাপও তাঁদের সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের পরিস্থিতি কর্মীদের চাকরি ছেড়ে দেওয়া বা অন্যত্র কাজ খোঁজার প্রবণতা বাড়াতে পারে। ফলে বিদ্যমান সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে স্বাস্থ্যকর্মীদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, পেশাগত সহায়তা এবং উন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
৪. শহর ও গ্রামের স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য বাড়তে পারে
স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি সব এলাকায় সমানভাবে দেখা যায় না। বড় শহরের হাসপাতালগুলোতে তুলনামূলক বেশি বিশেষজ্ঞ ও আধুনিক সুবিধা থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে অনেক সময় চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত নার্স না থাকলে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
এর ফলে যাতায়াতের খরচ, সময় এবং চিকিৎসা নেওয়ার অন্যান্য বাধা বাড়ে। দরিদ্র পরিবার, প্রবীণ ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী মানুষ এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে এমন রোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। WHO-ও প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং তাঁদের ধরে রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বাংলাদেশের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশেও স্বাস্থ্যকর্মীর পর্যাপ্ততা এবং তাঁদের সুষম বণ্টন স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। WHO-এর বাংলাদেশবিষয়ক একটি প্রতিবেদনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা গেলে রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মাতৃ ও শিশুসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
তবে দেশের বর্তমান স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ জানতে হালনাগাদ জাতীয় তথ্য, পেশাভিত্তিক জনবল, কর্মস্থলভিত্তিক বণ্টন এবং জনসংখ্যার তুলনায় কর্মীর অনুপাত বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। শুধু মোট চিকিৎসক বা নার্সের সংখ্যা দিয়ে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তব চিত্র বোঝা যায় না; তাঁরা কোথায় কর্মরত এবং কী ধরনের সেবা দিচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সংকট মোকাবিলায় কী করা প্রয়োজন?
- প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা সম্প্রসারণ: চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর মানসম্মত শিক্ষা এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো।
- প্রয়োজনভিত্তিক নিয়োগ: জনসংখ্যা, রোগের ধরন ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা অনুযায়ী কর্মী নিয়োগ ও পদায়ন করা।
- গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা: প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, আবাসন বা অন্যান্য প্রণোদনা এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা।
- কর্মীদের ধরে রাখা: ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা।
- দলগত ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করা: চিকিৎসক, নার্স, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ও অন্যান্য পেশাজীবীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো।
- তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা: কোথায় কোন ধরনের কর্মীর ঘাটতি রয়েছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করে নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করা।
শেষ কথা
বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট শুধু কর্মীর সংখ্যা কম থাকার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তাঁদের প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, বণ্টন, কাজের পরিবেশ এবং ধরে রাখার সক্ষমতা। সময়মতো চিকিৎসা, রোগীর নিরাপত্তা ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এসব বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করার পাশাপাশি তাঁদের প্রয়োজনীয় স্থানে নিয়োগ, সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদে পেশায় ধরে রাখার ব্যবস্থা করা গেলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
তথ্যসূত্র:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO): Health Workforce
WHO: Global Strategy on Human Resources for Health
WHO: স্বাস্থ্যকর্মীর বৈশ্বিক ঘাটতি ও জনবল পরিকল্পনা
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0