শিশুদের স্থূলতা মোকাবিলায় নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করল WHO
শিশু ও কিশোরদের স্থূলতা মোকাবিলায় নতুন বৈশ্বিক নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে WHO। এতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, আচরণ পরিবর্তন ও বয়সভিত্তিক চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার ক্রমবর্ধমান সমস্যা মোকাবিলায় নতুন বৈশ্বিক নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর প্রকাশিত এই নির্দেশিকায় শিশুদের স্থূলতা ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, আচরণগত পরিবর্তন এবং পরিবারকেন্দ্রিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বয়স ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বা অস্ত্রোপচার এড়িয়ে চলার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের কাছে শিশুদের স্থূলতা এখন শুধু ওজন বেড়ে যাওয়ার সমস্যা নয়; এটি শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা। তাই কেবল শিশুর ওজন কমানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে তার সামগ্রিক স্বাস্থ্য, বৃদ্ধি, পুষ্টি, ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা এবং পারিবারিক পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা ও সহায়তা দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে WHO।
বিশ্বজুড়ে শিশুদের স্থূলতা কতটা উদ্বেগজনক?
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রায় ৪০ কোটি শিশু ও কিশোর অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ১৭ কোটি ছিল স্থূলতায় আক্রান্ত। ১৯৯০ সালে এই বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্থূলতার হার ছিল প্রায় ২ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে এই বয়সী শিশু-কিশোরদের মধ্যে স্থূলতার হার প্রায় চার গুণ হয়েছে।
শৈশবে স্থূলতা থাকলে পরবর্তী জীবনে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন নিয়ে উপহাস, বৈষম্য বা হয়রানির শিকার হলে শিশুর আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে শিশুদের স্থূলতা প্রতিরোধের পাশাপাশি যারা ইতোমধ্যে এই সমস্যায় আক্রান্ত, তাদের উপযুক্ত চিকিৎসা ও সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন নির্দেশিকায় কী বলা হয়েছে?
WHO শিশু ও কিশোরদের স্থূলতা ব্যবস্থাপনার জন্য দুটি পৃথক নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। একটি ২৯ দিন বয়স থেকে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য, অন্যটি ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরদের জন্য। নির্দেশিকাগুলোতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, সমন্বিত এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশিকার প্রধান বিষয়গুলো হলো:
- পরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস: শিশুর বয়স, পুষ্টির প্রয়োজন ও পারিবারিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণে সহায়তা করা।
- নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম: বয়সোপযোগী খেলাধুলা, হাঁটা এবং অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো।
- আচরণ পরিবর্তন: শিশুর পাশাপাশি অভিভাবক বা পরিচর্যাকারীদের সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা।
- সমন্বিত চিকিৎসা: প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম ও আচরণগত সহায়তাকে একসঙ্গে যুক্ত করা।
- ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: উপযুক্ত ক্ষেত্রে অভিভাবক বা পরিচর্যাকারীর তত্ত্বাবধানে ডিজিটাল স্বাস্থ্যভিত্তিক সহায়তা বিবেচনা করা।
WHO শিশুদের স্থূলতা ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম এবং আচরণ পরিবর্তনভিত্তিক হস্তক্ষেপের জোরালো সুপারিশ করেছে। এসব উদ্যোগ শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিগতভাবে অথবা সমন্বিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেওয়া যেতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে ওষুধ ব্যবহারে সতর্কতা
নতুন নির্দেশিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বয়সভেদে চিকিৎসার পার্থক্য স্পষ্ট করা। ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের স্থূলতা চিকিৎসায় ওষুধ, ওজন কমানোর অস্ত্রোপচার বা ওজন কমানোর যন্ত্র ব্যবহারের সুপারিশ করেনি WHO। এই বয়সে শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম এবং আচরণগত সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরদের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ওষুধ বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে তা সবার জন্য নয়। তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সমন্বিত জীবনযাপনভিত্তিক কর্মসূচিতে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া গেলে, উপযুক্ত চিকিৎসাগত মূল্যায়নের পর এ ধরনের চিকিৎসা বিবেচনা করা যেতে পারে। গুরুতর স্থূলতার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কঠোর শর্ত পূরণ হলে অস্ত্রোপচারও বিবেচনায় আসতে পারে। এসব সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নিতে হবে।
অভিভাবকদের মনে রাখা প্রয়োজন, শিশুর ওজন কমানোর জন্য নিজে থেকে ওষুধ, সাপ্লিমেন্ট বা কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণ শুরু করা নিরাপদ নয়। শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত না করে স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনার জন্য চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পরিবার কীভাবে শিশুদের স্থূলতা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে?
শিশুর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই শিশুকে শুধু কম খেতে বলা বা ওজন নিয়ে সমালোচনা করার পরিবর্তে পুরো পরিবারের দৈনন্দিন অভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা বেশি কার্যকর হতে পারে।
- প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য এবং উপযুক্ত প্রোটিনের উৎস রাখুন।
- চিনিযুক্ত পানীয় ও অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবারের ব্যবহার সীমিত করুন।
- শিশুকে বয়সোপযোগী খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নিতে উৎসাহিত করুন।
- ঘুমের নিয়মিত সময়সূচি তৈরি করুন এবং বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- দীর্ঘ সময় বসে থাকা ও বিনোদনের জন্য পর্দা ব্যবহারের সময়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখুন।
- শিশুর ওজন বা শারীরিক গঠন নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য না করে তার স্বাস্থ্য ও সুস্থতার দিকে মনোযোগ দিন।
শিশুর ওজন বয়স ও উচ্চতার তুলনায় উপযুক্ত কি না, তা বয়সভিত্তিক বৃদ্ধি-চার্ট ও চিকিৎসাগত মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ব্যবহৃত বডি মাস ইনডেক্সের সীমা সরাসরি শিশুদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ঠিক নয়।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নির্দেশিকা?
বাংলাদেশে শিশুদের পুষ্টি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অপুষ্টির পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরিবার, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর খাবার ও খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করা শিশুদের সুস্থ বিকাশে সহায়তা করতে পারে। তবে বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে স্থূলতার বর্তমান হার বা প্রবণতা সম্পর্কে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দিতে হলে নির্ভরযোগ্য জাতীয় জরিপ ও হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।
WHO-এর নতুন নির্দেশিকা নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ এবং শিশুদের পরিচর্যাকারীদের জন্য একটি বৈশ্বিক কাঠামো দেয়। বাংলাদেশে এই নির্দেশনা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস, আর্থসামাজিক অবস্থা, স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা এবং শিশুদের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
শিশুদের স্থূলতা মোকাবিলায় শুধু ওজন কমানো নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। WHO-এর নতুন নির্দেশিকা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, আচরণগত সহায়তা এবং বয়সভিত্তিক চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবার, স্কুল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করলে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
শিশুর ওজন বা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে নিজে থেকে কঠোর ডায়েট বা ওষুধ শুরু না করে চিকিৎসক বা যোগ্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), শিশু ও কিশোরদের স্থূলতা ব্যবস্থাপনা বিষয়ক নির্দেশিকা, প্রকাশিত ৭ অক্টোবর ২০২৬।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0