বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ বাড়ছে, টিকাদানে ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ বাড়ছে। টিকাদানে ঘাটতি, শিশুদের টিকা না পাওয়া ও অসম্পূর্ণ টিকাদান রোগটির বিস্তার ঠেকাতে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে হামের সংক্রমণ
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের সংক্রমণ আবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাসজনিত রোগের বিস্তার মূলত তখনই দ্রুত বাড়তে পারে, যখন কোনো জনগোষ্ঠীতে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানুষ টিকার মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফের সর্বশেষ টিকাদান তথ্য বলছে, ২০২৫ সালেও বিশ্বের অনেক শিশু নিয়মিত হামের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশে রোগটির প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
টিকাদানে এখনও বড় ঘাটতি
WHO ও UNICEF-এর ২০২৫ সালের জাতীয় টিকাদান কাভারেজের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মাত্র ৮৪ শতাংশ শিশু হামের টিকার প্রথম ডোজ (MCV1) পেয়েছে এবং দ্বিতীয় ডোজ (MCV2) পেয়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ শিশু। অথচ হাম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় জনসংখ্যাগত সুরক্ষা বজায় রাখতে প্রায় ৯৫ শতাংশ কভারেজ প্রয়োজন।
২০২৫ সালে প্রায় ২১ মিলিয়ন শিশু নিয়মিতভাবে হামের টিকার প্রথম ডোজ পায়নি। একই সময়ে প্রায় ৭.৩ মিলিয়ন শিশু ডিপথেরিয়া, টিটেনাস ও পারটুসিসের প্রথম ডোজ নেওয়ার পর হামের টিকা নেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে যায়। এসব ঘাটতি কোনো এলাকায় জমতে থাকলে সেখানে সংক্রমণের জন্য বড় একটি সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী তৈরি হতে পারে।
২০২৫ সালে ৫৭ দেশে বড় হামের প্রাদুর্ভাব
WHO ও UNICEF জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের ৫৭টি দেশে বড় বা উল্লেখযোগ্য হামের প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া গেছে। সংস্থাগুলো বলছে, টিকাদানের কাভারেজ প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে থাকা, শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন দেশে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় কোনো একটি এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি তৈরি হলে আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে দ্রুত অন্যদের মধ্যেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকাদান থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়ে।
হাম কেন এতটা উদ্বেগের বিষয়?
হাম সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরে ছড়িয়ে পড়া লালচে ফুসকুড়ির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অনেক ক্ষেত্রে রোগী সুস্থ হয়ে উঠলেও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা হতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।
WHO জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৯৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হামের কারণে হয়েছে। এসব মৃত্যুর বড় অংশ ছিল টিকা না নেওয়া বা পর্যাপ্ত টিকা না পাওয়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে। একই সঙ্গে সংস্থাটি বলছে, ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হামের টিকাদানের মাধ্যমে প্রায় ৫৯ মিলিয়ন মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশেও হামের সংক্রমণ নিয়ে সতর্কতা
হামের বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বাংলাদেশেও ২০২৬ সালে উল্লেখযোগ্য সংক্রমণ দেখা গেছে। WHO-এর ২৩ এপ্রিল ২০২৬-এর Disease Outbreak News অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে বাংলাদেশে ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী এবং প্রায় ২,৯০০ পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছিল। ওই সময়ে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়।
WHO-এর মূল্যায়নে, আক্রান্তদের বড় অংশ ছিল শিশু এবং অনেক রোগী টিকা না নেওয়া অথবা মাত্র এক ডোজ টিকা পাওয়া অবস্থায় ছিল। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৪-২০২৫ সময়ে MR টিকার সরবরাহ ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে ফাঁক এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী অতিরিক্ত হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম না হওয়ায় কিছু এলাকায় সংবেদনশীল শিশুদের সংখ্যা বেড়েছে।
২০২৬ সালের জুনে WHO দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের বিশেষজ্ঞরাও বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে স্থানীয় পর্যায়ে টিকাদানের ঘাটতি পূরণ এবং রোগ নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
কাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা দরকার?
- টিকার কোনো ডোজ না পাওয়া শিশু
- অসম্পূর্ণ টিকাদান সম্পন্ন শিশু
- পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু
- অপুষ্টিতে ভোগা শিশু
- রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল ব্যক্তি
- সংক্রমণ বেশি এমন এলাকায় বসবাসকারী পরিবার
তবে শুধু শিশুদের নয়, যেকোনো বয়সের টিকাবিহীন বা অপর্যাপ্তভাবে টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তির হাম হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই ব্যক্তির বয়স ও জাতীয় টিকাদান সূচি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা সম্পন্ন হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
হাম প্রতিরোধে টিকাদানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা নেওয়া। WHO বলছে, নিরাপদ ও কার্যকর হামের টিকা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং এটি রোগ ও গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো এলাকায় টিকাদানের হার কমে গেলে শুধু টিকা না নেওয়া শিশুই নয়, নির্দিষ্ট বয়সে টিকা নেওয়ার সুযোগ না পাওয়া বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা মানুষও পরোক্ষভাবে ঝুঁকিতে পড়ে।
WHO ও UNICEF মনে করছে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি যেসব শিশু কোনো ডোজ পায়নি বা অসম্পূর্ণ টিকাদানে রয়েছে, তাদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনা জরুরি। সংঘাতপূর্ণ এলাকা, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, দুর্গম অঞ্চল ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিভাবকদের কী করা উচিত?
অভিভাবকদের প্রথমে সন্তানের টিকাদান কার্ড বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রেকর্ড দেখে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া হয়েছে কি না। কোনো ডোজ বাদ পড়ে থাকলে নিজের সিদ্ধান্তে টিকা বাদ না দিয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা যেতে পারে।
জ্বরের সঙ্গে কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে শিশুকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রেখে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, পানিশূন্যতা, খিঁচুনি বা শিশুর অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
টিকাদানের ঘাটতি কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রাদুর্ভাবের সময় টিকা দেওয়াই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা, টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের শনাক্ত করা এবং রোগ নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি টিকা নিয়ে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
WHO ও UNICEF-এর সর্বশেষ তথ্য দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক টিকাদান কাভারেজ কিছুটা উন্নত হলেও তা এখনও হাম প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় মাত্রায় পৌঁছায়নি। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিকাদানের ঘাটতি দ্রুত কমানো এবং প্রতিটি শিশুকে প্রয়োজনীয় টিকার আওতায় আনা এখনো গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার।
``` **তথ্যসূত্র:** WHO ও UNICEF-এর ২০২৫ সালের বৈশ্বিক টিকাদান হিসাব, WHO-এর ২০২৬ সালের হামের তথ্য এবং বাংলাদেশ পরিস্থিতি সম্পর্কিত WHO Disease Outbreak News।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0