হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে চলতি বছরে মৃত্যু ১,০৮৪—শেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ জন
বাংলাদেশে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা ১,০৮৪-এ পৌঁছেছে। শেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ জনের মৃত্যু ও ১,২০১টি নতুন সন্দেহজনক কেস শনাক্ত হয়েছে।
হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে চলতি বছরে মৃত্যু ১,০৮৪—শেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ জন
বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৪ জনে। তবে এই সংখ্যার সবগুলো মৃত্যুকে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
DGHS-এর হিসাবে, মোট ১ হাজার ৮৪টি মৃত্যুর মধ্যে ১০১টি মৃত্যু পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগীর এবং ৯৮৩টি মৃত্যু হয়েছে হাম-সদৃশ উপসর্গ থাকা রোগীদের। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় যে তিনজন মারা গেছেন, তাদের সবাইকে সন্দেহজনক হামজনিত মৃত্যু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
শেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্ত ও সন্দেহজনক কেস
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ২০১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে পরীক্ষাগারে আরও ৬৪ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। ফলে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে হাম-সদৃশ উপসর্গের মোট কেস দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৮৩৩ এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা হয়েছে ২১ হাজার ১৫।
অর্থাৎ, হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে শনাক্ত হওয়া প্রত্যেক রোগী যে নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত—এমন নয়। পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা আলাদাভাবে হিসাব করা হচ্ছে। ফলে উপসর্গভিত্তিক ও পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগীর তথ্য আলাদা করে দেখা জরুরি।
হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি
১৫ মার্চ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৬৪ হাজার ২৪৮ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৮০৭ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেও ১ হাজার ৯৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে DGHS-এর তথ্য জানিয়েছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়লে হাসপাতালগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি হলে শিশু ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগ এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়।
কেন এত মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ?
হাম সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দিয়ে শুরু হতে পারে। পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। অনেক শিশু চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠলেও অপুষ্টি, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা অন্যান্য শারীরিক জটিলতা থাকলে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। তাই শিশুর দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া ও ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ঢাকা বিভাগে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি
সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যায় ঢাকা বিভাগ এগিয়ে রয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে ৪৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর সিলেট বিভাগে ১৭৩, রাজশাহীতে ৯৩, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে ৭৮ জন করে, বরিশালে ৬০, খুলনায় ৪৩ এবং রংপুরে ১৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
এই বিভাগভিত্তিক সংখ্যাগুলো মূলত হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর তথ্যকে প্রতিফলিত করে। তাই এগুলোকে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যুর বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।
টিকাদান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপগুলোর একটি হলো টিকাদান। শিশুদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হলে সংক্রমণ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। কোনো শিশুর টিকার ডোজ বাদ পড়ে গেলে অভিভাবকদের স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের কাছ থেকে পরবর্তী করণীয় জেনে নেওয়া উচিত।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের মধ্যে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি এলাকায় টিকাদানের হার কমে গেলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বাড়তে পারে এবং যারা বয়স, স্বাস্থ্যগত কারণ বা অন্য কোনো কারণে টিকা নিতে পারেনি, তারাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
হাম সন্দেহ হলে কী করবেন?
শিশুর জ্বরের সঙ্গে কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে হাম বা অন্য কোনো সংক্রমণের সম্ভাবনা বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। হাম সন্দেহ হলে শিশুকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে দূরে রাখা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া কমাতে সহায়ক হতে পারে।
- শিশুর জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গকে অবহেলা না করা
- হাম সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
- অন্য শিশুদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা
- নির্ধারিত টিকার ডোজগুলো সময়মতো নিশ্চিত করা
- শিশুর শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া
হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় হাসপাতালে রোগী ব্যবস্থাপনার সময় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। হাম সন্দেহভাজন রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা রাখা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করা জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসাকেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড় থাকলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে করা একটি গবেষণাতেও হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে থাকার সঙ্গে সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তবে ওই গবেষণাটি নির্দিষ্ট হাসপাতালভিত্তিক ও পর্যবেক্ষণমূলক হওয়ায় এর হার পুরো দেশের সব রোগীর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়।
মৃত্যুর সংখ্যার ক্ষেত্রে সতর্কভাবে তথ্য বুঝতে হবে
বর্তমান পরিস্থিতিতে ১ হাজার ৮৪টি মৃত্যুর সংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর মধ্যে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু এবং হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু—দুটি আলাদা শ্রেণি রয়েছে। DGHS-এর তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু ১০১ এবং সন্দেহজনক বা হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৯৮৩।
সুতরাং সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে ‘হামে ১ হাজার ৮৪ জনের মৃত্যু’ বলার পরিবর্তে ‘হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে সম্মিলিতভাবে ১ হাজার ৮৪ জনের মৃত্যু’ বলা তথ্যগতভাবে বেশি নির্ভুল। কারণ সন্দেহভাজন মৃত্যুগুলোর সবকটিই পরীক্ষায় হাম হিসেবে নিশ্চিত হয়নি।
সচেতনতা ও টিকাদানে গুরুত্ব
বাংলাদেশে চলমান এই প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা এবং হাম সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রোগী শনাক্তকরণ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
শেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও তিনজনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ২০১টি নতুন সন্দেহজনক কেস শনাক্ত হওয়ার তথ্য দেখাচ্ছে যে পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তাই অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে শিশুর টিকা নিশ্চিত করা, উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0