বিশ্বজুড়ে বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ: চিকিৎসায় কতটা বড় ঝুঁকি?
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বাড়ায় অনেক সংক্রমণের চিকিৎসা কঠিন হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, ভুল প্রয়োগ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি এই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ কী এবং কেন বাড়ছে?
অ্যান্টিবায়োটিক আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণসহ বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের চিকিৎসায় এসব ওষুধ বহু মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কিছু ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করছে। ফলে যে ওষুধ একসময় কার্যকর ছিল, সেটি নির্দিষ্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে আর কাজ নাও করতে পারে। এই ঘটনাকে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বলা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২৫ সালের বৈশ্বিক নজরদারি প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত সাধারণ ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রায় প্রতি ছয়টির একটিতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ পাওয়া গেছে। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পর্যবেক্ষণ করা ৪০ শতাংশের বেশি জীবাণু-অ্যান্টিবায়োটিক সমন্বয়ে প্রতিরোধ বেড়েছে।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ কেন বড় চিকিৎসা ঝুঁকি?
অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের হাতে কার্যকর ওষুধের বিকল্প কমে যেতে পারে। সাধারণ সংক্রমণও তখন দীর্ঘস্থায়ী বা জটিল হয়ে উঠতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়, যেগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি হতে পারে এবং চিকিৎসার খরচও বাড়তে পারে।
WHO-এর মতে, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের কারণে সংক্রমণ চিকিৎসা করা কঠিন বা কখনো অসম্ভব হয়ে যেতে পারে। এতে গুরুতর অসুস্থতা, অক্ষমতা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময় ও চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়তে পারে।
কোন কারণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বাড়ছে?
১. প্রয়োজন না থাকলেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
অ্যান্টিবায়োটিক শুধু নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ক্ষেত্রে কাজ করে। সাধারণ সর্দি-কাশি, ফ্লু বা অন্যান্য ভাইরাসজনিত সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। কিন্তু ভাইরাসজনিত অসুস্থতায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে ব্যক্তির উপকার হওয়ার বদলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
২. ভুল অ্যান্টিবায়োটিক বা ভুলভাবে ব্যবহার
কোন জীবাণুর বিরুদ্ধে কোন অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর হবে, তা সংক্রমণের ধরন ও রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে। প্রয়োজন ছাড়া, ভুল ওষুধ বা ভুল মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে প্রতিরোধী জীবাণু তৈরি ও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৩. নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা
আগের প্রেসক্রিপশন দেখে একই ধরনের উপসর্গে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা নিরাপদ নয়। একই উপসর্গের পেছনে ভিন্ন ধরনের সংক্রমণ বা অন্য কারণ থাকতে পারে। তাই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন কি না এবং কোন ওষুধ উপযুক্ত, তা চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারণ করা উচিত।
৪. সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি
প্রতিরোধী জীবাণু শুধু অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মাধ্যমেই তৈরি বা ছড়ায় না। অপর্যাপ্ত হাত পরিষ্কার রাখা, দুর্বল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি এবং কম টিকাদানও সংক্রমণের বিস্তার বাড়াতে পারে। সংক্রমণ যত বেশি হবে, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজনও তত বাড়তে পারে।
এর প্রভাব শুধু হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নয়
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। প্রতিরোধী জীবাণু মানুষে মানুষে, প্রাণী থেকে মানুষে এবং দূষিত খাবার, পানি বা পরিবেশের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও মানুষের চলাচলের কারণে একটি অঞ্চলে তৈরি হওয়া প্রতিরোধী জীবাণু অন্য দেশেও পৌঁছাতে পারে।
WHO-এর ২০২৪ সালের ব্যাকটেরিয়াল অগ্রাধিকার তালিকায় ২৪টি অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, যেগুলো গুরুতর সংক্রমণ ঘটাতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যতের চিকিৎসায় এর প্রভাব কী হতে পারে?
অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা কমে গেলে শুধু সংক্রমণের চিকিৎসাই কঠিন হবে না, আধুনিক চিকিৎসার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বড় অস্ত্রোপচার, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, ক্যানসারের কিছু চিকিৎসা এবং অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির ক্ষেত্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের ক্ষেত্রে রোগীকে দীর্ঘসময় হাসপাতালে থাকতে হতে পারে, অতিরিক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে এবং তুলনামূলক বেশি খরচের বিকল্প চিকিৎসা নিতে হতে পারে। কিছু গুরুতর সংক্রমণে কার্যকর চিকিৎসার বিকল্প অত্যন্ত সীমিত হয়ে যেতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ঠেকাতে সাধারণ মানুষ কী করতে পারেন?
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না।
- সর্দি, ফ্লু বা সাধারণ ভাইরাসজনিত অসুস্থতায় নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না।
- চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন মনে করলে নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করুন।
- অন্য ব্যক্তির প্রেসক্রিপশনের অ্যান্টিবায়োটিক নিজের জন্য ব্যবহার করবেন না।
- অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়ে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন।
- নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখুন এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।
- প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ ও সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা বজায় রাখুন।
অ্যান্টিবায়োটিক কি সবসময় ক্ষতিকর?
না। প্রয়োজনের সময় সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক জীবন রক্ষা করতে পারে। সমস্যা হলো প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ব্যবহার করা বা ভুলভাবে ব্যবহার করা। তাই অ্যান্টিবায়োটিককে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা নয়, বরং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক রোগীর ক্ষেত্রে সঠিক ওষুধের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার, দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়, সংক্রমণ প্রতিরোধ, নজরদারি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতনতা থেকেই শুরু হতে পারে প্রতিরোধ
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ এমন একটি সমস্যা যার প্রভাব একজন রোগীর চিকিৎসা থেকে শুরু করে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে। বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার বাড়তে থাকায় কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক সংরক্ষণ এখন জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তাই জ্বর বা সর্দি-কাশি হলেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া, আগের প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করা বা অন্যের ওষুধ ব্যবহার করার মতো অভ্যাস এড়িয়ে চলা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা উভয়েই ভূমিকা রাখতে পারে।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0