বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ বাড়ছে, টিকাদানে ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ ও প্রাদুর্ভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। টিকাদানে ঘাটতি ও অসম্পূর্ণ টিকাদানের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে বহু শিশু।

সেপ্টে 23, 2026 - 15:27
 0  2
বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ বাড়ছে, টিকাদানে ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ
**বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ বাড়ছে, টিকাদানে ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ**

বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ নিয়ে নতুন উদ্বেগ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হামের সংক্রমণ ও প্রাদুর্ভাব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাসজনিত রোগের বিস্তার বিশেষ করে তখন দ্রুত বাড়তে পারে, যখন কোনো জনগোষ্ঠীতে পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষ টিকার মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২১ মিলিয়ন শিশু হামের টিকার প্রথম ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একই সময়ে প্রথম ডোজের বৈশ্বিক টিকাদান কভারেজ ছিল ৮৪ শতাংশ, যা হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার তুলনায় কম।

টিকাদানের ঘাটতিই বড় উদ্বেগ

হাম এমন একটি রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে কোনো এলাকায় টিকাবিহীন বা অপর্যাপ্তভাবে টিকাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বাড়লে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। WHO-এর মতে, হাম প্রতিরোধে একটি জনগোষ্ঠীতে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৫ সালের বৈশ্বিক টিকাদান তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩.৫ মিলিয়ন শিশু কোনো ধরনের টিকার প্রথম ডোজও পায়নি। এসব শিশুকে ‘জিরো-ডোজ’ শিশু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংঘাত, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় বাধা, টিকার সরবরাহ সমস্যা, দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ এবং টিকাদান কর্মসূচিতে বিভিন্ন ধরনের ঘাটতি—এসব কারণে অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদানের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

হাম কেন এত সংক্রামক?

হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং আশপাশের টিকাবিহীন বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকা ব্যক্তিরা আক্রান্ত হতে পারেন। এ কারণে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা এমন স্থান যেখানে অনেক মানুষ একসঙ্গে থাকেন, সেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

সাধারণত হামের প্রধান লক্ষণের মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরে ছড়িয়ে পড়া লালচে ফুসকুড়ি। তবে রোগটি শুধু সাময়িক জ্বর বা ফুসকুড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো গুরুতর জটিলতাও দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বেশি।

বাংলাদেশেও ২০২৬ সালে বড় প্রাদুর্ভাব

বিশ্বের পরিস্থিতির পাশাপাশি বাংলাদেশেও ২০২৬ সালে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। WHO-এর ২৩ এপ্রিল ২০২৬-এর Disease Outbreak News অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী এবং প্রায় ২ হাজার ৯০০ পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছিল। একই সময়ে ৫৮টি জেলায় সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়।

WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের বড় অংশই ছিল শিশু। রিপোর্ট করা রোগীদের প্রায় ৭৯ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে এবং মৃত্যুর বড় অংশ ছিল টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে। ২০২৬ সালের এই প্রাদুর্ভাবকে WHO বাংলাদেশের জন্য উচ্চ ঝুঁকির পরিস্থিতি হিসেবে মূল্যায়ন করেছিল, কারণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণ চলছিল এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ছাড়াই ছিল।

টিকাদানে ঘাটতি কেন তৈরি হলো?

WHO-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ২০২৪-২০২৫ সময়ে হাম-রুবেলা টিকার সরবরাহে ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে ফাঁক এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী অতিরিক্ত হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না হওয়ায় কিছু বয়সী শিশুর মধ্যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি জমেছে।

এর ফলে এমন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেক শিশু হয় টিকা নেয়নি, নয়তো মাত্র একটি ডোজ পেয়েছে। WHO বলছে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের বড় অংশ এক থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে দেখা গেছে, যা কিছু বয়সী গোষ্ঠীতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

টিকাবিহীন শিশুদের ঝুঁকি বেশি

হাম প্রতিরোধে টিকাদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা। যেসব শিশু টিকা নেয়নি বা টিকার প্রয়োজনীয় ডোজ সম্পন্ন করেনি, তাদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। আবার কিছু শিশু এমন বয়সে আক্রান্ত হতে পারে, যখন তারা নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সে এখনও পৌঁছায়নি।

বাংলাদেশের ২০২৬ সালের প্রাদুর্ভাবে নয় মাসের কম বয়সী কিছু শিশুও আক্রান্ত হয়েছে বলে WHO জানিয়েছে। এসব শিশুকে সুরক্ষিত রাখতে তাদের আশপাশের বয়সযোগ্য শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের টিকাদানের মাধ্যমে সামগ্রিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।

হাম প্রতিরোধে টিকার ভূমিকা

হামের টিকা নিরাপদ ও কার্যকর এবং গুরুতর অসুস্থতা ও জটিলতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হামের টিকাদানের মাধ্যমে প্রায় ৫৯ মিলিয়ন মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। তবুও ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৯৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে হামের কারণে, যাদের বেশিরভাগই ছিল টিকা না নেওয়া বা অপর্যাপ্তভাবে টিকা পাওয়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

WHO নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হামের টিকার প্রয়োজনীয় ডোজ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়। কোনো এলাকায় অনেক শিশু টিকাদানের বাইরে থেকে গেলে অতিরিক্ত বা বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা যেতে পারে।

বাংলাদেশে নেওয়া হয়েছে জরুরি পদক্ষেপ

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার WHO, UNICEF ও Gavi-এর সহায়তায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। ৫ এপ্রিল ২০২৬ থেকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এই কার্যক্রম শুরু হয় এবং পরবর্তীতে দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হয়। কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল বিশেষ করে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে টিকাদানের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা।

এর পাশাপাশি রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি জোরদার, পরীক্ষাগার সক্ষমতা বৃদ্ধি, হাসপাতালের প্রস্তুতি, সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশব্যাপী কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল ৬–৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে দ্রুত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো।

অভিভাবকদের কী করা উচিত?

অভিভাবকদের সন্তানের টিকাদান কার্ড বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের রেকর্ড পরীক্ষা করে বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া হয়েছে কি না নিশ্চিত করা উচিত। কোনো ডোজ বাদ পড়ে থাকলে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা প্রয়োজন।

জ্বরের সঙ্গে কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে শিশুকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রেখে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা, খিঁচুনি, পানিশূন্যতা বা শিশুর অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

টিকাদানের ঘাটতি পূরণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শুধু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে শক্তিশালী করা, টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা, টিকা থেকে বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের শনাক্ত করা এবং দ্রুত টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগ নজরদারি ও দ্রুত শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।

WHO-এর সর্বশেষ বৈশ্বিক তথ্য দেখাচ্ছে, ২০২৫ সালে হামের প্রথম ডোজের বৈশ্বিক কভারেজ ৮৪ শতাংশে ছিল। এই হার ২০১৯ সালের ৮৬ শতাংশের চেয়েও কম। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তৈরি হওয়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি হামের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। তাই প্রতিটি শিশুকে সময়মতো প্রয়োজনীয় টিকার আওতায় আনা, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকাদান সম্পন্ন করা এবং সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই এই রোগের বিস্তার ও গুরুতর জটিলতা কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

``` **তথ্যসূত্র:** WHO-এর ২০২৬ সালের বৈশ্বিক টিকাদান ও হাম পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশে ২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাব সম্পর্কিত Disease Outbreak News।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখিত দুঃখিত 0
ওয়াউ ওয়াউ 0
admin mediscript (Medi+Script) is dedicated to advancing health awareness, medical education, and community well-being. Our organization serves as a vibrant platform where healthcare knowledge meets daily living, aiming to inspire hope, happiness, and a healthier future for all. Our mission is to empower individuals, families, and communities with reliable, up-to-date medical information and research. We are committed to supporting both the public and healthcare professionals with educational resources that foster informed decision-making and promote wellness. By bridging modern medical science with everyday life, mediscript inspires people to embrace healthier habits, seek new knowledge, and pursue happiness through holistic well-being. Together, we are building a brighter, more hopeful future—one script at a time.