হাসপাতালে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য সংসদীয় কমিটির জোর সুপারিশ
সরকারি হাসপাতালের শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
হাসপাতালে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য সংসদীয় কমিটির জোর সুপারিশ
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট দূর করতে শূন্য পদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তর—স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর (DGFP) এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর (DGNM)—এর মোট ২ লাখ ৩৪ হাজার ২৪টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৭৩ হাজার ৪৫টি পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ পদে বর্তমানে কোনো জনবল নেই।
জনবল সংকটে চাপ বাড়ছে স্বাস্থ্যসেবায়
হাসপাতালের অবকাঠামো, শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুবিধা থাকলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, সহায়ক কর্মী ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি থাকলে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় জনবল সংকট চিকিৎসাসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শূন্য পদ দ্রুত পূরণের ওপর গুরুত্ব
কমিটির আলোচনায় সরকারি হাসপাতালের শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান জনবল ঘাটতি মোকাবিলায় আউটসোর্সিংয়ের পরিবর্তে অনুমোদিত শূন্য পদে সরাসরি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ হাসপাতালের জনবল নিয়োগ শুধু সংখ্যাগত ঘাটতি পূরণের বিষয় নয়; সংশ্লিষ্ট পদের জন্য যোগ্য ও প্রশিক্ষিত কর্মী নিশ্চিত করাও রোগীর নিরাপদ চিকিৎসাসেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু অবকাঠামো বাড়ালেই হবে না
দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি সেখানে প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কমিটির বৈঠকে একজন সদস্যের বক্তব্য হিসেবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু অবকাঠামো বাড়ালেই যথেষ্ট নয়; সেবা দিতে প্রয়োজনীয় জনবলও থাকতে হবে।
বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার পরিধি বাড়ানো এবং জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ, ডায়ালাইসিস, ক্যানসার, কিডনি ও হৃদ্রোগ চিকিৎসার সুবিধা সম্প্রসারণের চলমান উদ্যোগ সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। এসব সেবা কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন।
চিকিৎসক ও নার্সের পাশাপাশি প্রয়োজন অন্যান্য কর্মীও
হাসপাতালের জনবল বলতে শুধু চিকিৎসক ও নার্সকে বোঝায় না। একটি হাসপাতাল কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, ল্যাবরেটরি কর্মী, রেডিওলজি ও ইমেজিং কর্মী, মিডওয়াইফ, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ওয়ার্ড সহকারী এবং প্রশাসনিক ও কারিগরি কর্মীরও প্রয়োজন হয়।
বিশেষ করে জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, প্রসূতি সেবা, ল্যাবরেটরি ও ডায়াগনস্টিক বিভাগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকলে চিকিৎসকদের ওপর কাজের চাপ বাড়তে পারে এবং রোগীদের অপেক্ষার সময়ও দীর্ঘ হতে পারে। তাই জনবল পরিকল্পনার ক্ষেত্রে হাসপাতালের প্রকৃত সেবার পরিধি ও রোগীর চাপ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
নার্সদের বদলি নিয়েও আলোচনা
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে নার্সদের বদলির বিষয়টিও আলোচনায় আসে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে নারী নার্সদের দূরবর্তী অঞ্চলে বদলি করার কারণে তাদের বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে দীর্ঘ দূরত্বে বদলি দেওয়ার ক্ষেত্রে কর্মীদের বাস্তব পরিস্থিতি ও পারিবারিক বিষয় বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় এসেছে।
স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত জনবলকে ধরে রাখার জন্য শুধু নিয়োগ নয়, কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা, আবাসন, প্রশিক্ষণ, পদায়ন ও বদলি নীতিতেও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি সেবা নিশ্চিত করতে কর্মবান্ধব পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গু ও হামের সময় জনবল সংকট আরও গুরুত্বপূর্ণ
দেশে একই সময়ে ডেঙ্গু ও হামের মতো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের বিষয়টিও সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আলোচিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। ফলে জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড, ল্যাবরেটরি ও অন্যান্য সেবায় পর্যাপ্ত জনবল থাকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে ডেঙ্গুর মৌসুমে জ্বরের রোগীর সংখ্যা বাড়লে রোগী পর্যবেক্ষণ, রক্ত পরীক্ষা, তরল ব্যবস্থাপনা ও গুরুতর রোগী শনাক্ত করার কাজে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। একইভাবে হামের প্রাদুর্ভাবের সময় শিশু রোগীদের চিকিৎসা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন হয়।
জনবল নিয়োগের পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণও জরুরি
হাসপাতালে জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করাও প্রয়োজন। বিশেষ করে সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় রোগী বাছাই, পৃথকীকরণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত কর্মী থাকা জরুরি।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ছাড়াও মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, হাসপাতাল-ফার্মেসি ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন
সরকারি হাসপাতালের জনবল সংকট সমাধানে শুধু শূন্য পদ পূরণ করাই যথেষ্ট নয়। কোন হাসপাতালে কতজন চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মী প্রয়োজন, কোন এলাকায় রোগীর চাপ বেশি, কোথায় বিশেষায়িত সেবা চালু হচ্ছে এবং কোথায় অতিরিক্ত জনবল প্রয়োজন—এসব তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নিয়োগের পর কর্মীদের যথাযথ পদায়ন, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রত্যন্ত ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে জনবল ধরে রাখার ব্যবস্থা করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে রাজধানী ও বড় শহরের হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
রোগীর সেবাই হওয়া উচিত জনবল পরিকল্পনার কেন্দ্র
হাসপাতালে পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রোগীদের সময়মতো, নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়া। চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি পূরণ করা গেলে জরুরি চিকিৎসা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, সংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনা এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক সংসদীয় কমিটির সুপারিশ তাই সরকারি হাসপাতালের শূন্য পদ পূরণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার বিষয়টিকে আবারও সামনে এনেছে। এখন সুপারিশগুলো কত দ্রুত ও কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, সেটিই স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0