দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি মস্তিষ্কে কী প্রভাব ফেলে? নতুন গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়বিক নেটওয়ার্কের সংযোগে পরিবর্তন আসতে পারে, যা মনোযোগ ও স্মৃতিকে প্রভাবিত করে।
দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি মস্তিষ্কে কী প্রভাব ফেলে?
ব্যস্ত জীবনযাপন, দীর্ঘ সময় কাজ, রাত জাগা কিংবা অনিয়মিত ঘুমের কারণে অনেক মানুষ নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম থেকে বঞ্চিত হন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ঘুমের ঘাটতি শুধু দিনের বেলায় ক্লান্তি তৈরি করে না, মস্তিষ্কের কার্যক্রমেও পরিবর্তন আনতে পারে। নতুন এক গবেষণায় ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়বিক নেটওয়ার্কের কার্যকরী সংযোগের পরিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট সম্পর্ক শনাক্ত করা হয়েছে।
২০২৬ সালে Nature Communications-এ প্রকাশিত গবেষণাটিতে বড় পরিসরের নিউরোইমেজিং তথ্য ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে ঘুম-বঞ্চিত এবং পর্যাপ্ত ঘুম নেওয়া মানুষের মস্তিষ্কের পার্থক্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা এমন একটি ‘নিউরাল সিগনেচার’ বা স্নায়বিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন, যা ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যকরী পরিবর্তনকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারে।
মস্তিষ্কের কোন অংশে পরিবর্তন দেখা যায়?
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের ঘাটতির প্রভাব শুধু মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং বিভিন্ন মস্তিষ্কীয় নেটওয়ার্কের মধ্যে যোগাযোগ বা কার্যকরী সংযোগে পরিবর্তন দেখা যায়। বিশেষ করে default mode network এবং dorsal attention network-এর পরিবর্তন গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই নেটওয়ার্কগুলো যথাক্রমে অভ্যন্তরীণ চিন্তা-প্রক্রিয়া এবং বাইরের তথ্যের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এর অর্থ হলো, নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ ধরে রাখা, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, শেখা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী চিন্তার ধরন পরিবর্তনের মতো কিছু মস্তিষ্কীয় কাজে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে গবেষণাটি থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না যে ঘুমের ঘাটতি সরাসরি স্থায়ীভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি করে। গবেষণাটি মূলত মস্তিষ্কের কার্যকরী সংযোগের পরিবর্তন শনাক্ত করেছে।
মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিতে প্রভাব
ঘুম শেখা ও স্মৃতি সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আগের গবেষণাগুলোতেও দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা এবং স্মৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, এমনকি অর্ধেক রাতের ঘুম কমে গেলেও হিপোক্যাম্পাস-নির্ভর বিভিন্ন ধরনের স্মৃতিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে ৭৯টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয় যে ঘুমের ঘাটতি নির্বাহী মস্তিষ্কীয় কার্যক্রমের বিভিন্ন অংশকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে কাজের স্মৃতি, মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং এক কাজ থেকে অন্য কাজে মানসিকভাবে পরিবর্তনের সক্ষমতায় ঘুমের ঘাটতির প্রভাব পাওয়া যায়।
এক রাত ভালো ঘুমালেই কি সব স্বাভাবিক হয়ে যায়?
নতুন গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ঘুমের ঘাটতির কিছু স্নায়বিক পরিবর্তন এক রাতের পুনরুদ্ধারমূলক ঘুমের পরও শনাক্ত করা গেছে। গবেষকেরা এমন একটি স্নায়বিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন, যা এক রাতের ঘুমের পর অবশিষ্ট মস্তিষ্কীয় পরিবর্তনও ধরতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে আংশিক ঘুমের ঘাটতি এবং মানুষের স্বাভাবিকভাবে কম ঘুমানোর অভ্যাসের সঙ্গেও এই বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে এক রাতের ঘুম কোনো উপকার করে না। বরং গবেষণাটি দেখায়, দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি হলে শুধু মাঝে মাঝে অতিরিক্ত ঘুম দিয়ে ঘাটতি পূরণ করা সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নাও হতে পারে। নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন কম ঘুমানোর ঝুঁকি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদিন প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমানো হলে মস্তিষ্ককে নিয়মিত কম বিশ্রামের অবস্থায় কাজ করতে হয়। এর ফলে মনোযোগ, প্রতিক্রিয়ার গতি, স্মৃতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো দৈনন্দিন কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। রাত জাগার অভ্যাস থাকা শিক্ষার্থী, শিফটে কাজ করা কর্মী এবং দীর্ঘ সময় কাজ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি গবেষণায় শিফটে কাজ করা নার্সদের ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে মনোযোগ এবং মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যক্রমে পরিবর্তনের সম্পর্কও পাওয়া গেছে। গবেষকেরা দেখেছেন, বিভিন্ন ধরনের মানসিক কাজ ঘুমের ঘাটতিতে একইভাবে প্রভাবিত নাও হতে পারে।
ঘুমের ঘাটতি পূরণে কী করা যেতে পারে?
ঘুমের ঘাটতি এড়াতে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং জাগার অভ্যাস তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। রাতে ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত আলো ও দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার কমানো, সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং ঘুমের পরিবেশ শান্ত ও আরামদায়ক রাখা সহায়ক হতে পারে।
- প্রতিদিন নিয়মিত সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
- প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে প্রায় ৭–৯ ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখা উচিত।
- ঘুমের আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার কমান।
- বিকেল বা সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ এড়িয়ে চলুন।
- নিয়মিত রাত জাগার অভ্যাস থাকলে ধীরে ধীরে ঘুমের সময় ঠিক করুন।
গবেষণার মূল বার্তা
নতুন গবেষণাটি দেখায়, ঘুমের ঘাটতি শুধু সাময়িক ক্লান্তির বিষয় নয়; এটি মস্তিষ্কের বিভিন্ন নেটওয়ার্কের কার্যকরী সংযোগের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন স্বাভাবিকের তুলনায় কম ঘুমানোর সঙ্গে ঘুম-বঞ্চিত অবস্থার মতো স্নায়বিক বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে গবেষণাটি ঘুমের ঘাটতি ও মস্তিষ্কের পরিবর্তনের সম্পর্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেও প্রতিটি ক্ষেত্রে স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত দেয় না। তাই ঘুমকে অবহেলা না করে নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত দিনের ঘুমভাব, নাক ডাকা বা ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হওয়ার মতো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0