রক্ত পরীক্ষায় কোন তথ্যগুলো আগেই স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে?
রক্তের শর্করা, কোলেস্টেরল, হিমোগ্লোবিন, কিডনি ও লিভারের কিছু মান আগেই বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে। জানুন কোন রিপোর্টে কী দেখা যায়।
রক্ত পরীক্ষায় আগেই কি স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া যায়?
অনেক রোগের শুরুতে স্পষ্ট কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। এমন অবস্থায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শরীরের ভেতরে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে। রক্ত পরীক্ষা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পরীক্ষাগুলোর একটি। রক্তের কোষ, শর্করা, চর্বি, বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ও অঙ্গের কার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু মান পরীক্ষা করে চিকিৎসক সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—রক্ত পরীক্ষার কোনো একটি ফল অস্বাভাবিক হলেই নির্দিষ্ট রোগ হয়েছে, এমন নয়। বয়স, লিঙ্গ, খাদ্যাভ্যাস, পানিশূন্যতা, ওষুধ, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য রোগের কারণে পরীক্ষার ফল পরিবর্তিত হতে পারে। তাই রিপোর্টের ফল চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে ব্যাখ্যা বা চিকিৎসা শুরু করা উচিত নয়।
১. হিমোগ্লোবিন ও রক্তের কোষ: অ্যানিমিয়ার ইঙ্গিত
সিবিসি বা কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (CBC) রক্তের লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা, প্লেটলেট, হিমোগ্লোবিন, হেমাটোক্রিট এবং লোহিত রক্তকণিকার আকারসহ বিভিন্ন তথ্য দেয়। এই পরীক্ষার ফল থেকে অ্যানিমিয়া, সংক্রমণ, কিছু রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা বা অন্যান্য শারীরিক অবস্থার বিষয়ে চিকিৎসক প্রাথমিক ধারণা পেতে পারেন।
বিশেষ করে হিমোগ্লোবিন বা লোহিত রক্তকণিকার মাত্রা কম থাকলে রক্তস্বল্পতার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। এর পেছনে আয়রনের ঘাটতি, রক্তক্ষরণ, ভিটামিন বি১২ বা ফোলেটের ঘাটতি, কিডনির কিছু সমস্যা কিংবা অন্যান্য কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু হিমোগ্লোবিন কম দেখেই আয়রনের ওষুধ শুরু করা ঠিক নয়; কারণটি খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
২. শ্বেত রক্তকণিকা: সংক্রমণ বা প্রদাহের ইঙ্গিত
সিবিসিতে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা বা WBC শরীরে সংক্রমণ বা প্রদাহের সম্ভাব্য ইঙ্গিত দিতে পারে। কোনো কোনো সংক্রমণ বা প্রদাহজনিত অবস্থায় WBC বেড়ে যেতে পারে। আবার কিছু পরিস্থিতিতে এর মাত্রা কমেও যেতে পারে।
তবে WBC বেশি মানেই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, আর কম মানেই গুরুতর রোগ—এমন সরল সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ওষুধ, শারীরিক চাপ, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সমস্যা এবং আরও অনেক কারণেও WBC পরিবর্তিত হতে পারে। তাই উপসর্গ ও অন্যান্য পরীক্ষার ফলের সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি মূল্যায়ন করা হয়।
৩. রক্তে শর্করা ও HbA1c: ডায়াবেটিসের আগাম সতর্কতা
রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা এবং HbA1c ডায়াবেটিস বা প্রিডায়াবেটিস শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ। HbA1c একবারের রক্তে শর্করার পরিবর্তে গত প্রায় তিন মাসের গড় রক্তে শর্করার একটি ধারণা দেয়।
সাধারণভাবে HbA1c ৫.৭ শতাংশের নিচে থাকলে তা স্বাভাবিক পরিসরের মধ্যে, ৫.৭ থেকে ৬.৪ শতাংশ প্রিডায়াবেটিস এবং ৬.৫ শতাংশ বা তার বেশি ডায়াবেটিসের নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়। তবে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে চিকিৎসক পরিস্থিতি অনুযায়ী পরীক্ষার ফল নিশ্চিত বা পুনরায় পরীক্ষা করতে পারেন।
প্রিডায়াবেটিসকে অবহেলা করা উচিত নয়। এই অবস্থায় ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের পাশাপাশি হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই রক্তে শর্করার সামান্য অস্বাভাবিকতাও জীবনযাপন পরিবর্তনের বিষয়ে আগাম সতর্ক হওয়ার সুযোগ দিতে পারে।
৪. কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড: হৃদ্রোগের ঝুঁকি
লিপিড প্রোফাইল বা লিপোপ্রোটিন প্যানেলে সাধারণত মোট কোলেস্টেরল, LDL, HDL এবং ট্রাইগ্লিসারাইড দেখা হয়। বিশেষ করে LDL-কে ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বলা হয়, কারণ অতিরিক্ত LDL ধমনিতে চর্বি জমা ও ব্লকেজের সঙ্গে সম্পর্কিত। উচ্চ কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড করোনারি হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই কোনো ব্যক্তির কোলেস্টেরল বেশি পাওয়া গেলে সেটিকে শুধু একটি সংখ্যার বিষয় হিসেবে না দেখে বয়স, রক্তচাপ, ধূমপান, ডায়াবেটিস, পারিবারিক ইতিহাস এবং অন্যান্য ঝুঁকির সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করা হয়।
৫. ক্রিয়েটিনিন ও eGFR: কিডনি কতটা ভালো কাজ করছে
কিডনি শরীরের বর্জ্য পদার্থ রক্ত থেকে ছেঁকে বের করে। রক্তের ক্রিয়েটিনিন এবং তা থেকে হিসাব করা eGFR কিডনি কতটা কার্যকরভাবে রক্ত পরিশোধন করছে, সে সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
eGFR কমে গেলে কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়। তবে একটি মাত্র রিপোর্ট দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ নিশ্চিত করা যায় না। NIDDK-এর তথ্য অনুযায়ী, কিডনি রোগ মূল্যায়নে রক্তের GFR-এর পাশাপাশি প্রস্রাবে অ্যালবুমিনের পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—শুধু ক্রিয়েটিনিনের সংখ্যা দেখেই কিডনির অবস্থা পুরোপুরি বোঝা যায় না। শরীরের পেশির পরিমাণসহ বিভিন্ন বিষয় ক্রিয়েটিনিনকে প্রভাবিত করতে পারে।
৬. লিভার-সম্পর্কিত রক্ত পরীক্ষা
লিভারের স্বাস্থ্য মূল্যায়নে রক্তে বিভিন্ন এনজাইম, প্রোটিন ও অন্যান্য উপাদান পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষার ফল লিভারের কোষে ক্ষতি বা লিভারের কার্যকারিতায় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাব্য ইঙ্গিত দিতে পারে।
তবে লিভারের কোনো একটি পরীক্ষার মান অস্বাভাবিক হলেই লিভারের নির্দিষ্ট রোগ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ওষুধ, সংক্রমণ, অন্যান্য শারীরিক সমস্যা এবং পরীক্ষার সময়কার অবস্থাও ফলকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক অতিরিক্ত পরীক্ষা বা ইমেজিংয়ের পরামর্শ দিতে পারেন।
৭. প্লেটলেট: রক্তপাত বা জমাট বাঁধার ঝুঁকি বোঝার একটি অংশ
প্লেটলেট রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। CBC পরীক্ষায় প্লেটলেটের সংখ্যাও দেখা যায়। মাত্রা খুব কম বা বেশি হলে চিকিৎসক রক্তপাত বা রক্তনালিতে অস্বাভাবিক জমাট বাঁধার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারেন।
তবে প্লেটলেটের অস্বাভাবিকতারও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু রিপোর্টের একটি সংখ্যা দেখে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শে কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।
৮. থাইরয়েডের কিছু সমস্যা রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়তে পারে
রক্তের TSH পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা করে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। থাইরয়েড কম বা বেশি সক্রিয় হলে ওজনের পরিবর্তন, ক্লান্তি, হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন, ঠান্ডা বা গরম সহ্য করতে অসুবিধাসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তবে সবার জন্য একই ধরনের থাইরয়েড পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। উপসর্গ, বয়স, পূর্বের রোগ ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে পরীক্ষা নির্ধারণ করা হয়।
শুধু রক্ত পরীক্ষা করলেই কি সব রোগ ধরা পড়ে?
না। রক্ত পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি স্বাস্থ্য মূল্যায়নের একটি অংশ মাত্র। অনেক রোগের জন্য শারীরিক পরীক্ষা, রক্তচাপ, ওজন, পারিবারিক ইতিহাস, প্রস্রাব পরীক্ষা, আল্ট্রাসাউন্ড, এক্স-রে বা অন্যান্য পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। আবার কোনো ব্যক্তির রক্তের ফল স্বাভাবিক থাকলেও তার উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি হতে পারে।
একইভাবে, রিপোর্টে কোনো একটি মান রেফারেন্স রেঞ্জের বাইরে গেলেই গুরুতর রোগ রয়েছে—এমনটিও নয়। ল্যাবরেটরি রেফারেন্স রেঞ্জ, বয়স, লিঙ্গ, ওষুধ, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক অবস্থার মতো বিষয় ফলাফল ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ।
রিপোর্ট হাতে পেলে কী করবেন?
- রিপোর্টের একটি অস্বাভাবিক মান দেখে নিজে থেকে রোগের সিদ্ধান্ত নেবেন না।
- প্রয়োজনে একই পরীক্ষা বা অতিরিক্ত পরীক্ষা চিকিৎসকের পরামর্শে করুন।
- আগের রিপোর্ট থাকলে চিকিৎসককে দেখান, কারণ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ।
- নিজে থেকে আয়রন, ভিটামিন, হরমোন বা অন্য কোনো ওষুধ শুরু করবেন না।
- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বা হৃদ্রোগের ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত ফলোআপ করুন।
শেষ কথা
রক্ত পরীক্ষার কিছু সাধারণ মান শরীরে সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ দিতে পারে। হিমোগ্লোবিন ও CBC অ্যানিমিয়া বা রক্তের কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে, HbA1c প্রিডায়াবেটিস বা ডায়াবেটিস শনাক্ত করতে সাহায্য করে, লিপিড প্রোফাইল হৃদ্রোগের ঝুঁকি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্রিয়েটিনিন ও eGFR কিডনির কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা দেয়। লিভার ও থাইরয়েডের পরীক্ষাও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
তবে রক্তের রিপোর্টকে কখনোই একা চূড়ান্ত রোগ নির্ণয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। সঠিক ব্যাখ্যার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ, উপসর্গ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যতথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0