ডেঙ্গুতে বাড়ছে মৃত্যু, সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার শঙ্কা
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করছে। সেপ্টেম্বরে রোগীর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কায় বাড়ছে সতর্কতা ও প্রস্তুতির প্রয়োজন।
বর্ষাকাল পেরিয়ে সেপ্টেম্বরের দিকে এগোতেই বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও সামনে আসছে। প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন নতুন রোগী। ফলে একদিকে যেমন ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে, অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতেও বাড়তি রোগীর চাপ সামলানোর প্রস্তুতি জরুরি হয়ে উঠছে।
ডেঙ্গু বাংলাদেশে নতুন কোনো রোগ নয়। তবে প্রতি বছর এর প্রকোপের ধরন ও তীব্রতা এক রকম থাকে না। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি জমে Aedes মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে পারে। সেপ্টেম্বরেও যদি অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকে এবং মশার ঘনত্ব কমানো না যায়, তাহলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
কেন সেপ্টেম্বর নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ?
ডেঙ্গুর বিস্তারের ক্ষেত্রে আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং মশার প্রজননস্থলের মতো বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। বর্ষার সময় বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকার কারণে এডিস মশার বংশবিস্তার সহজ হয়। বাড়ি, অফিস, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা আশপাশের পরিত্যক্ত জায়গায় অল্প পরিমাণ পানি জমেও মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে।
এই কারণে বর্ষার পরেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমে যাবে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়। বরং জমে থাকা পানি অপসারণ ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
মৃত্যু বাড়ার পেছনে কী থাকতে পারে?
ডেঙ্গু আক্রান্ত অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে উঠলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এটি গুরুতর আকার নিতে পারে। বিশেষ করে রোগী যদি সময়মতো চিকিৎসা না পান কিংবা গুরুতর সতর্কতামূলক লক্ষণগুলো উপেক্ষা করা হয়, তাহলে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ডেঙ্গুর গুরুতর অবস্থায় শরীরে তরল ভারসাম্যের সমস্যা, রক্তক্ষরণ, শক বা বিভিন্ন অঙ্গের কার্যকারিতায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই শুধু জ্বর কমে যাওয়াকে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ কী?
হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, দুর্বলতা, বমি বমি ভাবসহ বিভিন্ন উপসর্গ ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে। তবে এসব উপসর্গ অন্যান্য রোগেও হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে ডেঙ্গু নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করানো উচিত।
বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার সময় রোগীর অবস্থা খেয়াল করা জরুরি। পেটের তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক অস্থিরতা বা ঘুমঘুম ভাবের মতো সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
হাসপাতালে কেন বাড়ছে চাপ?
একটি এলাকায় একই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে হাসপাতালে রোগীর চাপ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। শুধু শয্যা নয়, চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সামগ্রীর ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
বিশেষ করে গুরুতর রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রোগীর চাপ সামলাতে পর্যাপ্ত জনবল, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা এবং দ্রুত রোগী শনাক্ত করার সক্ষমতা থাকা জরুরি।
নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
জ্বর হলেই নিজের সিদ্ধান্তে বিভিন্ন ওষুধ খাওয়া নিরাপদ নয়। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে কোন ওষুধ ব্যবহার করা উচিত এবং কোনটি এড়িয়ে চলা প্রয়োজন, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরি। বিশেষ করে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন কিছু ওষুধ নিজের সিদ্ধান্তে গ্রহণ করা উচিত নয়।
ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে অতিরিক্ত পানি বা তরলও সব রোগীর জন্য একইভাবে উপযুক্ত নয়। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং রোগের পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসা ভিন্ন হতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। শুধু মশা নিধনের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশে পানি জমতে না দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
- ফুলের টব ও টবের নিচের পাত্রে পানি জমতে দেবেন না।
- বালতি, ড্রাম ও অন্যান্য পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন।
- পরিত্যক্ত বোতল, কৌটা, টায়ার ও প্লাস্টিকের পাত্র সরিয়ে ফেলুন।
- ছাদ, বারান্দা ও নির্মাণস্থলে পানি জমছে কি না নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
- জানালা ও দরজায় মশা প্রতিরোধের ব্যবস্থা রাখুন।
- দিনের বেলাতেও প্রয়োজনীয় মশা প্রতিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
- জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হলেও নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ কঠিন। একটি বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি পাশের বাড়িতেও মশার সংখ্যা বাড়াতে পারে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধকে শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, বাজার, নির্মাণাধীন ভবন ও আবাসিক এলাকাগুলোতেও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করার উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি থাকলে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব।
জ্বরকে অবহেলা নয়
ডেঙ্গুর মৌসুমে জ্বর হলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে অবহেলাও করা যাবে না। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে উপসর্গের পরিবর্তন দ্রুত লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ।
রোগীর অবস্থা খারাপ হলে বা সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। ডেঙ্গু সম্পর্কে ভুল তথ্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনির্ভরযোগ্য পরামর্শ অনুসরণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
সেপ্টেম্বর হতে পারে সতর্কতার গুরুত্বপূর্ণ সময়
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকলে সেপ্টেম্বর মাসে রোগীর সংখ্যা ও হাসপাতালের চাপ আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে তা নির্ভর করবে সংক্রমণের প্রবণতা, আবহাওয়া, মশার ঘনত্ব, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এবং মানুষের সচেতনতার মতো একাধিক বিষয়ের ওপর।
তাই আতঙ্ক ছড়ানোর পরিবর্তে এখন থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। বাড়ির ভেতর ও বাইরে পানি জমতে না দেওয়া, নিয়মিত পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
সম্মিলিত উদ্যোগেই কমতে পারে ঝুঁকি
ডেঙ্গু প্রতিরোধ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। স্বাস্থ্য বিভাগকে চিকিৎসা প্রস্তুতি জোরদার করার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের নিজেদের বাড়ি ও কর্মস্থলের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।
ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সতর্কতামূলক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা। আর সংক্রমণ কমাতে হলে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কাজ নিয়মিতভাবে চালিয়ে যেতে হবে। সেপ্টেম্বরের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই সচেতন হওয়াই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0