বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, টিকাদানে ঘাটতিতে বাড়ছে উদ্বেগ

বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ আবারও বাড়ছে। টিকাদানের ঘাটতি ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে নতুন করে ৩৪ লাখ শিশুকে টিকাদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সেপ্টে 29, 2026 - 10:28
 0  2
বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, টিকাদানে ঘাটতিতে বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ আবারও বাড়ছে। টিকাদানের ঘাটতি ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে নতুন করে ৩৪ লাখ শিশুকে টিকাদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, টিকাদানে ঘাটতিতে বাড়ছে উদ্বেগ

বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। কয়েক মাস ধরে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ দৈনিক আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর গড় আবারও বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৬ দিনে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২২৯টি হামের কেস এবং ১ হাজার ৭২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এই দুই সূচকই মে মাসের দৈনিক গড়কে ছাড়িয়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের দৈনিক মৃত্যুর গড়ও মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে শিশুদের মধ্যে টিকাদানের ঘাটতি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ফাঁককে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। এপ্রিল ২০২৬-এ WHO জানিয়েছিল, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল এবং আক্রান্তদের বড় অংশ ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। WHO-এর মূল্যায়নে, টিকা না নেওয়া বা আংশিক টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্য ছিল।

টিকাদানের ঘাটতি কেন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে?

হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানুষ টিকাপ্রাপ্ত না থাকলে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল—তাদের গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বেশি। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, অন্ধত্ব, মস্তিষ্কে প্রদাহসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।

WHO-এর এপ্রিলের পরিস্থিতি মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সময় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আক্রান্ত শিশু টিকা নেয়নি অথবা হামের টিকার মাত্র একটি ডোজ পেয়েছিল। একই সঙ্গে কিছু শিশু টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হয়েছে। এক থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণের বড় অংশ পাওয়া গেছে, যা বিভিন্ন বয়সী শিশুর মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

টিকার সরবরাহ ও নিয়মিত টিকাদানে বিঘ্ন

WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৫ সময়ে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার দেশব্যাপী মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনা এবং নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতির কারণে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ফাঁক তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২০ সালের পর নিয়মিতভাবে দেশব্যাপী সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না হওয়াও ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে WHO উল্লেখ করেছে।

তবে টিকাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আগের অগ্রগতিও উল্লেখযোগ্য। WHO জানিয়েছে, দীর্ঘ সময়ে হামের টিকার আওতা বাড়ায় দেশে নিশ্চিত হামের সংক্রমণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। বর্তমান প্রাদুর্ভাব সেই অর্জন কতটা ভঙ্গুর হতে পারে, তা আবার সামনে এনেছে।

এপ্রিলের জরুরি টিকাদান কর্মসূচি

প্রাদুর্ভাবের তীব্রতার মধ্যে বাংলাদেশ সরকার WHO, UNICEF ও Gavi-এর সহযোগিতায় এপ্রিল মাসে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে ১৮টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ জেলার ৩০টি উপজেলায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১২ লাখের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে কর্মসূচিটি আরও বিস্তৃত করা হয়।

WHO-এর পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, দেশব্যাপী কর্মসূচিতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বিনামূল্যে এমআর টিকার একটি ডোজ দেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছিল। দুর্গম এলাকা, প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, পরিবহনকেন্দ্র এবং নগর এলাকায় অতিরিক্ত কৌশল ব্যবহার করে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়।

সেপ্টেম্বরে আবারও নতুন টিকাদান উদ্যোগ

এপ্রিল-মে মাসের জরুরি টিকাদান কর্মসূচির পরও সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় সরকার সেপ্টেম্বরে নতুন করে ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। কর্মসূচিটি ৩৬ দিন ধরে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এর আগে প্রায় ২ কোটি শিশু হাম-রুবেলার টিকা পেয়েছে; তবে আরও প্রায় ৩৪ লাখ শিশু এখনো টিকাদানের মাধ্যমে সুরক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন। WHO-এর বাংলাদেশ কার্যালয়ও এসব শিশুর কাছে দ্রুত পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

শুধু টিকাদান নয়, নিয়মিত কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ

হাম নিয়ন্ত্রণে জরুরি বা ক্যাচ-আপ টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির শক্তিশালী বাস্তবায়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। WHO বলছে, হাম নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজসহ টিকাদানের কভারেজ সব এলাকায় অন্তত ৯৫ শতাংশের কাছাকাছি এবং সমানভাবে বজায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো শিশু টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ছে কি না, তা স্থানীয় পর্যায়ে শনাক্ত করার জন্য কার্যকর নজরদারি দরকার।

বিশেষ করে দুর্গম এলাকা, ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে বসতি, দরিদ্র পরিবার এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে তুলনামূলকভাবে দূরে থাকা জনগোষ্ঠীর শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। WHO-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাম্প্রতিক আলোচনাতেও বলা হয়েছে, উচ্চ টিকাদান কভারেজ থাকলেও যেসব শিশু এখনো বাদ পড়ে যাচ্ছে, তাদের কাছে পৌঁছানোই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

হাম প্রতিরোধে পরিবারের করণীয়

শিশুর টিকাদান কার্ড বা রেকর্ড অনুযায়ী নির্ধারিত সব টিকা নেওয়া হয়েছে কি না, অভিভাবকদের তা নিশ্চিত করা উচিত। কোনো ডোজ বাদ পড়ে থাকলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করে শিশুর জন্য কী করণীয়, তা জেনে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে চলমান প্রাদুর্ভাবের সময়ে শিশুর জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিলে তাকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে দূরে রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

হামের সন্দেহে অসুস্থ শিশুকে ভিড়যুক্ত অপেক্ষাকক্ষ বা অন্য রোগীদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয়ভাবে মেলামেশা করানো উচিত নয়। WHO প্রাদুর্ভাবের সময়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে আলাদা রাখা এবং হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ প্রতিরোধ জোরদারের পরামর্শ দিয়েছে।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি ও দ্রুত ব্যবস্থা জরুরি

হামের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু টিকাদানের সমস্যা নয়; এটি রোগ শনাক্তকরণ, তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত। কোনো এলাকায় সংক্রমণ বাড়তে শুরু করলে দ্রুত শনাক্ত করা এবং আক্রান্তদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা করা গেলে আরও বিস্তার কমানোর সুযোগ থাকে।

সেপ্টেম্বরের সংক্রমণ বৃদ্ধির তথ্য দেখাচ্ছে, আগের টিকাদান কর্মসূচির পরও কিছু শিশু সুরক্ষার বাইরে রয়েছে। ফলে চলমান ক্যাচ-আপ কর্মসূচির পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদানকে শক্তিশালী করা, বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

টিকাদানের ঘাটতি পূরণই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব দেখিয়েছে যে অতীতে অর্জিত টিকাদান অগ্রগতি ধরে রাখতে নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন কর্মসূচি প্রয়োজন। জরুরি টিকাদান কর্মসূচি তাৎক্ষণিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষা বাড়াতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রতিটি শিশুর নির্ধারিত টিকা নিশ্চিত করাই সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর মূল ভিত্তি।

WHO-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে বড় সংখ্যক সংবেদনশীল শিশু, টিকাদানে ঘাটতি এবং বিভিন্ন এলাকায় চলমান সংক্রমণ জড়িত। তাই টিকাদানের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং হাসপাতালভিত্তিক নিরাপদ চিকিৎসা—সবগুলো ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), WHO Bangladesh, UNICEF এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর-ভিত্তিক সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পরিস্থিতি প্রতিবেদন।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখিত দুঃখিত 0
ওয়াউ ওয়াউ 0
admin mediscript (Medi+Script) is dedicated to advancing health awareness, medical education, and community well-being. Our organization serves as a vibrant platform where healthcare knowledge meets daily living, aiming to inspire hope, happiness, and a healthier future for all. Our mission is to empower individuals, families, and communities with reliable, up-to-date medical information and research. We are committed to supporting both the public and healthcare professionals with educational resources that foster informed decision-making and promote wellness. By bridging modern medical science with everyday life, mediscript inspires people to embrace healthier habits, seek new knowledge, and pursue happiness through holistic well-being. Together, we are building a brighter, more hopeful future—one script at a time.