নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস: কোন ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক?
নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ার অভ্যাসে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ, লিভার-কিডনির ক্ষতি ও বিপজ্জনক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস কেন ঝুঁকিপূর্ণ?
মাথাব্যথা, জ্বর, সর্দি-কাশি, গ্যাস্ট্রিক বা শরীরের সামান্য ব্যথা হলেই অনেকেই আগের প্রেসক্রিপশন দেখে কিংবা পরিচিত কারও পরামর্শে নিজের মতো করে ওষুধ খেয়ে থাকেন। কখনো ফার্মেসি থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ কেনা হয়, আবার কখনো আগের অসুস্থতার বেঁচে যাওয়া ওষুধ নতুন সমস্যায় ব্যবহার করা হয়। সহজ সমাধান মনে হলেও এই অভ্যাস সবসময় নিরাপদ নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, ভুলভাবে ওষুধ ব্যবহার করা বিশ্বজুড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি, কম বা ভুল ওষুধ ব্যবহার, ভুল মাত্রা গ্রহণ এবং নিজের মতো করে প্রেসক্রিপশন-নির্ভর ওষুধ খাওয়া—সবই অনিরাপদ ওষুধ ব্যবহারের উদাহরণ।
১. সর্দি-কাশিতে নিজের মতো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া
নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার অভ্যাস সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি। সাধারণ সর্দি, ফ্লু ও অনেক ধরনের কাশি ভাইরাসের কারণে হয়। এসব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। অথচ জ্বর বা গলা ব্যথা হলেই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করার প্রবণতা দেখা যায়।
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অপব্যবহার ও অতিরিক্ত ব্যবহার ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ। ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া সাধারণ ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের প্রায় প্রতি ছয়টির একটিতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। WHO-এর বাংলাদেশভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সংগ্রহ ও নিজের মতো ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই অ্যান্টিবায়োটিকের প্যাকেজে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া সেবন না করার বিষয়ে সতর্কবার্তা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২. একই উপাদানযুক্ত একাধিক ওষুধ একসঙ্গে খাওয়া
অনেকে একই সময়ে ব্যথার ওষুধের পাশাপাশি সর্দি-জ্বরের ওষুধ খান। কিন্তু বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ওষুধে একই সক্রিয় উপাদান থাকতে পারে। ফলে একজন ব্যক্তি না জেনেই একই ওষুধের উপাদান একাধিকবার গ্রহণ করতে পারেন।
বিশেষ করে প্যারাসিটামল বা অ্যাসিটামিনোফেন বিভিন্ন ব্যথা, জ্বর এবং সর্দি-কাশির ওষুধে থাকতে পারে। FDA সতর্ক করেছে, একাধিক অ্যাসিটামিনোফেনযুক্ত ওষুধ একসঙ্গে গ্রহণ করলে অনিচ্ছাকৃতভাবে অতিরিক্ত মাত্রা হয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত অ্যাসিটামিনোফেন গুরুতর লিভারের ক্ষতি এমনকি লিভার ফেইলিওরের কারণ হতে পারে।
তাই একই সময়ে একাধিক ওষুধ খাওয়ার আগে প্রতিটির সক্রিয় উপাদান বা active ingredient পরীক্ষা করা জরুরি। সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. ব্যথানাশক ওষুধ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাওয়া
মাথাব্যথা, দাঁতের ব্যথা, কোমর বা শরীরের ব্যথায় অনেকেই নিয়মিত ব্যথানাশক গ্রহণ করেন। কিন্তু সব ব্যথার কারণ এক নয় এবং দীর্ঘদিন নিজের মতো করে ব্যথানাশক খেলে মূল রোগের চিকিৎসা বিলম্বিত হতে পারে।
বিশেষ করে আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন ও ডাইক্লোফেনাকের মতো NSAID শ্রেণির ওষুধ কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পেটের আলসার বা রক্তপাত এবং কিডনির সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব ওষুধ অন্য কিছু ওষুধের সঙ্গেও পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
যাদের কিডনির রোগ, পেটের আলসার, হৃদ্রোগ বা নির্দিষ্ট অন্য স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। তাই নিয়মিত ব্যথা হলে শুধু ওষুধ খেয়ে উপসর্গ চাপা না দিয়ে ব্যথার কারণ শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
৪. আগের প্রেসক্রিপশন দেখে নতুন অসুস্থতায় ওষুধ খাওয়া
একবার কোনো রোগের জন্য চিকিৎসক যে ওষুধ দিয়েছেন, একই ধরনের উপসর্গ আবার দেখা দিলেই সেই ওষুধ আবার খাওয়া নিরাপদ—এমন ধারণা ভুল হতে পারে। একই ধরনের উপসর্গের পেছনে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে জ্বর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু বা অন্য অনেক রোগের কারণে হতে পারে। শুধু জ্বরের উপস্থিতি দেখে নির্দিষ্ট ওষুধ শুরু করলে প্রকৃত রোগ শনাক্ত করতে দেরি হতে পারে এবং ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
৫. ওষুধের মাত্রা নিজের মতো করে বাড়ানো
একটি ওষুধ খেয়ে দ্রুত উপকার না পেলে অনেকেই নির্ধারিত সময়ের আগেই আবার একই ওষুধ খান বা একবারে বেশি মাত্রা গ্রহণ করেন। কিন্তু বেশি মাত্রা মানেই বেশি দ্রুত সুস্থ হওয়া নয়। বরং কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাত্রা গুরুতর বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে।
FDA-এর তথ্য অনুযায়ী, প্যারাসিটামল/অ্যাসিটামিনোফেনের অতিরিক্ত গ্রহণে গুরুতর লিভার ক্ষতি হতে পারে এবং ওভারডোজের পর প্রথমদিকে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে।
তাই প্রেসক্রিপশন বা ওষুধের লেবেলে দেওয়া মাত্রা নিজের মতো করে পরিবর্তন করা উচিত নয়। শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বয়স ও ওজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
৬. অন্যের প্রেসক্রিপশন বা ওষুধ ব্যবহার করা
একই উপসর্গ থাকলেও দুই ব্যক্তির জন্য একই ওষুধ উপযুক্ত নাও হতে পারে। বয়স, ওজন, গর্ভাবস্থা, কিডনি ও লিভারের কার্যকারিতা, অন্য রোগ এবং বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধ—এসব বিষয় ওষুধ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে রক্ত পাতলা করার ওষুধ, ঘুমের ওষুধ, স্টেরয়েড, কিছু মানসিক রোগের ওষুধ এবং হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের সঙ্গে অন্য ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই অন্যের প্রেসক্রিপশন দেখে নিজের জন্য একই ওষুধ শুরু করা নিরাপদ পদ্ধতি নয়।
৭. উপসর্গ কমলেই দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ বন্ধ করা
নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি আরেকটি বিপজ্জনক অভ্যাস হলো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ বা অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধ অনেক সময় উপসর্গ না থাকলেও রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজন হয়।
তাই “ভালো লাগছে” মানেই রোগ নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন ধরে নিয়ে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। চিকিৎসক যে সময়ের জন্য ওষুধ দিয়েছেন, পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করাই নিরাপদ।
৮. ওষুধের সঙ্গে অন্য ওষুধ বা সাপ্লিমেন্টের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া উপেক্ষা করা
অনেকে প্রেসক্রিপশন ওষুধের পাশাপাশি ভিটামিন, হারবাল পণ্য বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করেন, কিন্তু চিকিৎসককে বিষয়টি জানান না। অথচ একাধিক ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট একসঙ্গে গ্রহণ করলে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। WHO-ও একাধিক ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাকে ওষুধ-সম্পর্কিত ক্ষতি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তাই চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় বর্তমানে খাওয়া সব ওষুধ, সাপ্লিমেন্ট ও প্রয়োজন হলে হারবাল পণ্যের নাম জানানো উচিত।
নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ার আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
- ওষুধের নামের পাশাপাশি এর সক্রিয় উপাদান দেখুন।
- একই উপাদানযুক্ত একাধিক ওষুধ একসঙ্গে খাবেন না।
- অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুরু করবেন না।
- অন্যের প্রেসক্রিপশন নিজের জন্য ব্যবহার করবেন না।
- নির্ধারিত মাত্রা নিজের মতো করে বাড়াবেন বা কমাবেন না।
- দীর্ঘদিনের রোগের ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বন্ধ করবেন না।
- নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে নতুন ওষুধ নেওয়ার আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে জানান।
- ওষুধের লেবেল ও নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ুন।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন?
ওষুধ খাওয়ার পর শ্বাসকষ্ট, মুখ বা গলা ফুলে যাওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, তীব্র মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক রক্তপাত, কালো পায়খানা, রক্তবমি, তীব্র পেটব্যথা বা অন্য কোনো গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত। NSAID ব্যবহারের ক্ষেত্রে পেটের রক্তপাত ও কিডনির সমস্যার মতো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে।
অতিরিক্ত মাত্রায় কোনো ওষুধ খেয়ে ফেললে উপসর্গ না থাকলেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্যারাসিটামল/অ্যাসিটামিনোফেনের অতিরিক্ত মাত্রায় শুরুতে উপসর্গ নাও দেখা যেতে পারে।
সচেতন ব্যবহারই সবচেয়ে নিরাপদ
নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস অনেক সময় সাময়িকভাবে উপসর্গ কমিয়ে দিতে পারে, কিন্তু ভুল ওষুধ, ভুল মাত্রা বা ভুল সময়ের ব্যবহার গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ব্যক্তির পাশাপাশি পুরো সমাজের জন্য অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ায়।
তাই সামান্য অসুস্থতাতেও সবসময় শক্তিশালী ওষুধ প্রয়োজন—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া, ওষুধের লেবেল পড়া এবং একই সক্রিয় উপাদানযুক্ত একাধিক ওষুধ এড়িয়ে চলাই নিরাপদ ওষুধ ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0