যুদ্ধ ও স্বাস্থ্য সংকট: সুদানে চিকিৎসাসেবা বন্ধের পথে বহু স্বাস্থ্যকেন্দ্র

যুদ্ধ, অর্থায়ন সংকট ও রোগের প্রাদুর্ভাবে সুদানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। বহু স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ বা সীমিত হওয়ায় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন লাখো মানুষ।

সেপ্টে 11, 2026 - 15:01
 0  2
যুদ্ধ ও স্বাস্থ্য সংকট: সুদানে চিকিৎসাসেবা বন্ধের পথে বহু স্বাস্থ্যকেন্দ্র
সুদান, স্বাস্থ্য সংকট, যুদ্ধ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, চিকিৎসাসেবা, মানবিক সংকট, Sudan, Health Crisis, WHO, MSF

যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থায়ন সংকট

তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ সুদানের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এমনিতেই বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা ও স্বাস্থ্যখাতে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি এখন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অথবা সীমিত পরিসরে সেবা দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগের মধ্যে থাকা লাখো মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

সুদানের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বর্তমানে একাধিক সংকটের সম্মুখীন—হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট, নিরাপত্তাহীনতা, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘাটতি একই সঙ্গে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

অর্থায়ন কমায় বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে ৩৩৫ স্বাস্থ্যসেবা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নেতৃত্বাধীন Sudan Health Cluster জুন ২০২৬-এ সতর্ক করে জানিয়েছিল, একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়ন কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে ১৩টি রাজ্যের ৩৩৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও স্বাস্থ্যসেবা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব সেবার ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল।

এর মধ্যে ১২৬টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার এবং আরও ১০৪টি কেন্দ্র সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকি ছিল। একইভাবে সাতটি হাসপাতালের সেবা বন্ধ এবং ১৮টি হাসপাতালের কার্যক্রম কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল। মোবাইল স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও ২০টি ক্লিনিক বন্ধ এবং আরও ১২টির কার্যক্রম কমে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল।

এই অর্থায়ন সংকটের ফলে প্রায় ১ হাজার ৮৪৮ জন চিকিৎসক, নার্স, ধাত্রী ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর কাজও ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।

এখনো অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্র অকার্যকর

WHO-এর এপ্রিল ২০২৬-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, সুদানের ১৮টি রাজ্যের প্রায় ৩৭ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যকর নয়। দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে এবং অনেক স্বাস্থ্যকর্মী নিরাপত্তার কারণে কর্মস্থল ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

WHO জানিয়েছে, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানে স্বাস্থ্যসেবার ওপর শত শত হামলা যাচাই করা হয়েছে। এসব হামলায় স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কিছু হাসপাতাল আংশিকভাবে চালু থাকলেও অনেক জায়গায় সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার আরেকটি বড় প্রভাব হলো রোগীদের দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে অন্য হাসপাতালে যেতে বাধ্য হওয়া। যুদ্ধের কারণে রাস্তাঘাট ও পরিবহনব্যবস্থা অনিরাপদ থাকায় জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ বিলম্ব হতে পারে।

রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে

স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো যখন বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ছে, তখন সুদানে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা যাচ্ছে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, হাম, পোলিও, হেপাটাইটিস-ই, মেনিনজাইটিস ও ডিপথেরিয়ার মতো রোগের সংক্রমণ রয়েছে।

যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রোগ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হচ্ছে। ঘনবসতিপূর্ণ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি এবং কম টিকাদান কভারেজ সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

অন্যদিকে অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকায় সংক্রমণের পর গুরুতর অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কাও বেশি। ফলে অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগ একে অপরকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।

হাসপাতালের ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত চাপ

একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হলে তার রোগীরা স্বাভাবিকভাবেই কাছাকাছি অন্য কার্যকর স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সুদানে কার্যকর চিকিৎসাকেন্দ্রের সংখ্যাও সীমিত। ফলে যে হাসপাতালগুলো এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোর ওপর রোগীর চাপ দ্রুত বাড়ছে।

MSF বা মেডিসিনস সঁ ফ্রঁতিয়ের জানিয়েছে, অর্থায়ন কমে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ হচ্ছে এবং এতে অবশিষ্ট হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আরও বাড়ছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, পর্যাপ্ত অর্থায়ন না থাকলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে।

কিছু এলাকায় পরিস্থিতি এতটাই সংকটপূর্ণ যে গর্ভবতী নারীদের জটিল প্রসবের জন্য কয়েক ঘণ্টা দূরের হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। জরুরি অস্ত্রোপচার বা সিজারিয়ান সেকশনের প্রয়োজন হলে এই দীর্ঘ যাত্রা মা ও শিশুর জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য সংকট আরও গভীর

সুদানের যুদ্ধ লাখো মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের বড় একটি অংশ অস্থায়ী ক্যাম্প বা অনিরাপদ এলাকায় বসবাস করছেন, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা সীমিত। এসব মানুষের মধ্যে গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছেন।

MSF জানিয়েছে, উম রাকুবা ক্যাম্পের আশপাশে গত পাঁচ বছরে মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সেখানে প্রায় ১৭ হাজার শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সীমিত চিকিৎসাসেবা অবশিষ্ট রয়েছে।

চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি খাদ্য, পুষ্টি, নিরাপদ পানি ও সুরক্ষা কর্মসূচিও অর্থায়ন সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ছে।

অর্থায়ন সংকট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

যুদ্ধের সময় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র সচল রাখতে শুধু ভবন ও চিকিৎসক থাকলেই হয় না। প্রয়োজন নিয়মিত ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন, অ্যাম্বুলেন্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন এবং রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্থ কমে গেলে এসব কার্যক্রম একে একে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

WHO-এর Sudan Health Cluster তাই জরুরি ও নমনীয় অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে আরও স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হতে পারে, স্বাস্থ্যকর্মী হারানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

শুধু অর্থ নয়, প্রয়োজন নিরাপদ স্বাস্থ্যব্যবস্থা

সুদানের স্বাস্থ্য সংকটের সমাধান শুধু অর্থায়ন বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও অ্যাম্বুলেন্সকে হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় মানবিক সহায়তার নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।

WHO-এর মতে, যুদ্ধের কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে তা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রয়োজন। তবে যুদ্ধ চলমান অবস্থায় জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে তাৎক্ষণিক অর্থায়ন ও মানবিক সহায়তা অপরিহার্য।

সুদানের স্বাস্থ্য সংকটের সামনে বড় প্রশ্ন

সুদানের পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধ শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; এটি একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তিও ধ্বংস করতে পারে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হলে টিকাদান, মাতৃ ও শিশুসেবা, জরুরি চিকিৎসা, অপুষ্টির চিকিৎসা এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বর্তমানে সুদানে যুদ্ধ ও অর্থায়ন সংকট একে অপরের প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক সহায়তা দ্রুত পুনরুদ্ধার করা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো সচল রাখা এখন শুধু চিকিৎসা খাতের প্রয়োজন নয়; এটি লাখো মানুষের জীবন রক্ষার জন্য জরুরি মানবিক পদক্ষেপ।

সুদানের জন্য সবচেয়ে স্থায়ী সমাধান অবশ্যই সংঘাতের অবসান ও শান্তি প্রতিষ্ঠা। তবে সেই সময় না আসা পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা যেন পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে, সে জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত ও ধারাবাহিক সহায়তা প্রয়োজন।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখিত দুঃখিত 0
ওয়াউ ওয়াউ 0
admin mediscript (Medi+Script) is dedicated to advancing health awareness, medical education, and community well-being. Our organization serves as a vibrant platform where healthcare knowledge meets daily living, aiming to inspire hope, happiness, and a healthier future for all. Our mission is to empower individuals, families, and communities with reliable, up-to-date medical information and research. We are committed to supporting both the public and healthcare professionals with educational resources that foster informed decision-making and promote wellness. By bridging modern medical science with everyday life, mediscript inspires people to embrace healthier habits, seek new knowledge, and pursue happiness through holistic well-being. Together, we are building a brighter, more hopeful future—one script at a time.