অর্থের অভাবে বন্ধ হচ্ছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ভয়াবহ মানবিক সংকটে সুদান

আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সুদানের বহু স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হচ্ছে। যুদ্ধ, রোগের প্রাদুর্ভাব ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যে চিকিৎসাসেবা আরও সংকটে পড়েছে।

সেপ্টে 11, 2026 - 14:56
 0  2
অর্থের অভাবে বন্ধ হচ্ছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ভয়াবহ মানবিক সংকটে সুদান
অর্থের অভাবে বন্ধ হচ্ছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ভয়াবহ মানবিক সংকটে সুদান

যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে অর্থায়নের ঘাটতি এবার দেশটির ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা ও স্বাস্থ্যখাতে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা সীমিত পরিসরে সেবা দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, অপুষ্টি ও সংক্রামক রোগের সঙ্গে লড়াই করা লাখো মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

অর্থায়ন সংকটে বন্ধ হচ্ছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার প্রভাবে সুদানে চলতি বছর অন্তত ৩৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছে। এসব কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল ৪ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি মানুষের চিকিৎসাসেবা সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে সহায়তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে।

মেডিসিনস সঁ ফ্রঁতিয়ের (MSF) সতর্ক করেছে, অর্থায়ন সংকটের কারণে বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্র কার্যক্রম কমিয়ে দিচ্ছে বা পুরোপুরি বন্ধ করছে। এর ফলে যেসব হাসপাতাল এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোর ওপর রোগীর চাপ দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সীমিত সক্ষমতার মধ্যেই অতিরিক্ত রোগী সামলাতে হচ্ছে।

যুদ্ধের ধাক্কায় আগেই বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা

সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (RSF) মধ্যে সংঘাত চলছে। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ স্বাস্থ্য অবকাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, বিদ্যুৎ, পানি ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটও তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, ২০২৬ সালে সুদানে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হবে। একই সময়ে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবার সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে। দেশটির ১৮টি রাজ্যের প্রায় ৩৭ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখনো অকার্যকর।

WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে স্বাস্থ্যসেবার ওপর শত শত হামলা যাচাই করা হয়েছে। এসব হামলায় স্বাস্থ্যকর্মী, রোগী ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অনেক এলাকায় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও সেগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

অর্থায়ন কমার প্রভাব কেন এত ভয়াবহ?

যুদ্ধের সময় স্বাস্থ্যব্যবস্থা সচল রাখতে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা যখন যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত হাসপাতাল, ক্লিনিক, জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র এবং মোবাইল মেডিকেল টিম সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে ওঠে।

কিন্তু এসব কর্মসূচির অর্থায়ন কমে গেলে চিকিৎসাকর্মীদের বেতন, ওষুধ কেনা, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ, অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। জুন ২০২৬-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সহায়তা ও বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধ বা কমে যাওয়ায় সুদানের স্বাস্থ্যখাতে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে সহায়তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে।

WHO-এর Sudan Health Cluster আগেই সতর্ক করেছিল যে অর্থায়ন অব্যাহত না থাকলে ১৩টি রাজ্যের ৩৩৫টি স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ বা কার্যক্রম কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

রোগের প্রাদুর্ভাবও বাড়ছে

স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে, যখন সুদানে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি রয়েছে। WHO জানিয়েছে, দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, হাম, পোলিও, হেপাটাইটিস-ই, মেনিনজাইটিস ও ডিপথেরিয়ার মতো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে।

বিশেষ করে বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। অনেক মানুষকে একাধিকবার ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে। অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অতিরিক্ত জনসংখ্যা, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি এবং অপুষ্টি সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

অর্থায়নের অভাবে টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ, মাতৃ ও শিশুসেবা এবং অপুষ্টির চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমও ব্যাহত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

দূরের হাসপাতালে যেতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা

একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রভাব শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের রোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রত্যন্ত বা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে চিকিৎসার জন্য অনেক দূরের এলাকায় যেতে হতে পারে। যুদ্ধের কারণে রাস্তা ও পরিবহনব্যবস্থা অনিরাপদ হওয়ায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য এই যাত্রা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

WHO জানিয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ বা স্থগিত হওয়ার কারণে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা রোগীদের অনেক সময় দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে কার্যকর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়ার পাশাপাশি রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা

সুদানের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট নয়; এটি একটি বৃহৎ মানবিক সংকটের অংশ। যুদ্ধের কারণে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং অনেক এলাকায় দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যখন স্বাস্থ্যসেবা কমে যায়, তখন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণ বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞ ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর মতে, স্বাস্থ্যসেবা টিকিয়ে রাখতে জরুরি ও নমনীয় অর্থায়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ অব্যাহত রাখা জরুরি।

আন্তর্জাতিক সহায়তা এখন গুরুত্বপূর্ণ

WHO এবং MSF উভয়েই সুদানের স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। অর্থায়ন সংকটের কারণে যদি আরও স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে অবশিষ্ট হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে এবং জরুরি চিকিৎসা, মাতৃসেবা, শিশুচিকিৎসা ও সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হতে পারে।

সুদানের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী সমাধান অবশ্যই সংঘাতের অবসান ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে যুদ্ধ চলাকালীন জীবনরক্ষাকারী স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে দ্রুত আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি ভবনের দরজা বন্ধ হওয়া নয়—এর অর্থ হতে পারে হাজারো মানুষের চিকিৎসার শেষ আশ্রয়টিও হারিয়ে যাওয়া।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখিত দুঃখিত 0
ওয়াউ ওয়াউ 0
admin mediscript (Medi+Script) is dedicated to advancing health awareness, medical education, and community well-being. Our organization serves as a vibrant platform where healthcare knowledge meets daily living, aiming to inspire hope, happiness, and a healthier future for all. Our mission is to empower individuals, families, and communities with reliable, up-to-date medical information and research. We are committed to supporting both the public and healthcare professionals with educational resources that foster informed decision-making and promote wellness. By bridging modern medical science with everyday life, mediscript inspires people to embrace healthier habits, seek new knowledge, and pursue happiness through holistic well-being. Together, we are building a brighter, more hopeful future—one script at a time.