বুকব্যথা হলেই কি হৃদরোগ? যে লক্ষণগুলো অবহেলা করা বিপজ্জনক
বুকব্যথার সব কারণ হৃদরোগ নয়। তবে বুকের চাপ বা ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঘাম, বমি ভাব বা চোয়াল-হাতে ব্যথা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
বুকে ব্যথা হলেই কি ধরে নিতে হবে যে হৃদরোগ হয়েছে? উত্তর হলো—না, সব বুকব্যথা হৃদরোগের কারণে হয় না। অ্যাসিডিটি বা হার্টবার্ন, পেশিতে টান, উদ্বেগসহ বিভিন্ন কারণেও বুকব্যথা হতে পারে। তবে বুকব্যথার কিছু ধরন এবং এর সঙ্গে থাকা নির্দিষ্ট উপসর্গ হার্ট অ্যাটাক বা অন্য গুরুতর হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার সংকেত হতে পারে। তাই বুকব্যথাকে শুধু গ্যাস বা সাধারণ সমস্যা ধরে নিয়ে অবহেলা করা ঝুঁকিপূর্ণ।
সব বুকব্যথা কি হৃদরোগের লক্ষণ?
বুকব্যথার কারণ একাধিক হতে পারে। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা ছাড়াও হজমতন্ত্র, ফুসফুস, বুকের পেশি বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণে ব্যথা হতে পারে। তাই শুধু ব্যথার উপস্থিতি দিয়ে হৃদরোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। চিকিৎসকেরা সাধারণত ব্যথার ধরন, অবস্থান, কতক্ষণ ধরে আছে, কীভাবে শুরু হয়েছে এবং অন্য কোনো উপসর্গ রয়েছে কি না—এসব বিবেচনা করে কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন।
তবে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বুকের মাঝখানে চাপ, চেপে ধরা, ভারী লাগা বা ব্যথা—বিশেষ করে কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হলে অথবা কমে গিয়ে আবার ফিরে এলে—হার্ট অ্যাটাকের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হতে পারে।
যে ধরনের বুকব্যথায় বেশি সতর্ক হবেন
হার্ট অ্যাটাকের সময় বুকের অস্বস্তি সবসময় তীব্র ব্যথা হিসেবে শুরু হয় না। কারও ক্ষেত্রে এটি ধীরে ধীরে হালকা অস্বস্তি বা চাপ হিসেবে শুরু হতে পারে এবং উপসর্গ আসা-যাওয়া করতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে হঠাৎ তীব্র উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে নিচের ধরনের উপসর্গ থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন:
- বুকের মাঝখানে চাপ, চেপে ধরা, ভারী লাগা বা ব্যথা
- ব্যথা বা অস্বস্তি এক বা দুই হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া
- বুকব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট হওয়া
- অকারণে ঠান্ডা ঘাম হওয়া
- বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
- মাথা ঝিমঝিম করা বা হঠাৎ দুর্বল লাগা
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি
- হৃদস্পন্দন দ্রুত বা অনিয়মিত মনে হওয়া
এসব উপসর্গের একটি বা একাধিক একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে উপসর্গ একই রকম নাও হতে পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে লক্ষণ কি আলাদা হতে পারে?
নারীদের ক্ষেত্রেও বুকব্যথা বা বুকের অস্বস্তি হার্ট অ্যাটাকের সাধারণ লক্ষণ। তবে কিছু নারীর ক্ষেত্রে বুকব্যথার পাশাপাশি বা তার পরিবর্তে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, পেটের অস্বস্তি, পিঠ বা কাঁধে ব্যথা এবং দুর্বলতার মতো উপসর্গ বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।
এ কারণে শুধু তীব্র বুকব্যথা না থাকলেই হৃদ্যন্ত্রের জরুরি সমস্যা নেই—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে একাধিক নতুন উপসর্গ একসঙ্গে দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
অ্যাসিডিটি আর হৃদ্যন্ত্রের ব্যথা কি আলাদা করা যায়?
অনেকেই বুকের অস্বস্তিকে “গ্যাস” বা অ্যাসিডিটি মনে করে অপেক্ষা করেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার অস্বস্তিকেও বদহজম বা হার্টবার্নের মতো মনে হতে পারে। আবার সত্যিই বুকব্যথার কারণ অ্যাসিডিটি বা অন্য কোনো সমস্যা হতে পারে। তাই শুধু ব্যথার অনুভূতি থেকে নিজে নিজে নিশ্চিত হওয়া নিরাপদ নয়।
বিশেষ করে বুকের অস্বস্তির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, মাথা ঘোরা, বমি ভাব অথবা হাত, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ব্যথা থাকলে “গ্যাস” ধরে নিয়ে অপেক্ষা করা উচিত নয়।
হার্ট অ্যাটাক কেন জরুরি অবস্থা?
হার্ট অ্যাটাক ঘটে যখন হৃদ্যন্ত্রের কোনো অংশে রক্ত ও অক্সিজেনের প্রবাহ হঠাৎ কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘসময় রক্তপ্রবাহ বন্ধ থাকলে হৃদ্পেশির ক্ষতি বাড়তে থাকে। তাই দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা শুরু করলে হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি কমানোর সুযোগ থাকে।
বুকব্যথা হলে কী করবেন?
নতুন, অস্বাভাবিক বা তীব্র বুকব্যথা হলে নিজে নিজে কারণ নির্ধারণ করার চেষ্টা না করে চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া উচিত। বিশেষ করে বুকের অস্বস্তির সঙ্গে উপরে উল্লেখিত সতর্কসংকেত থাকলে এটিকে জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা থাকলে জরুরি চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করা এবং সম্ভব হলে অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে হাসপাতালে যাওয়াই নিরাপদ। জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা পথে প্রাথমিক মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা শুরু করতে পারেন।
নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো যদি হার্ট অ্যাটাকের মতো জরুরি উপসর্গ থাকে। কারণ পথে অবস্থার অবনতি হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
কোন লক্ষণগুলো কখনো অবহেলা করবেন না?
- কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী বা বারবার ফিরে আসা বুকের চাপ বা ব্যথা
- বুকের ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া
- বুকের অস্বস্তির সঙ্গে শ্বাসকষ্ট
- অকারণে ঠান্ডা ঘাম
- হঠাৎ মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা
- বমি বমি ভাব বা বমি
- হঠাৎ দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের অনুভূতি
এ ধরনের উপসর্গ থাকলে ব্যথা কমে যাওয়ার অপেক্ষা করা উচিত নয়। হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ কখনও হালকা হতে পারে বা সাময়িকভাবে কমেও যেতে পারে।
শুধু বুকব্যথার ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়
কিছু হার্ট অ্যাটাক খুব স্পষ্ট লক্ষণ ছাড়াও ঘটতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে তুলনামূলক কম বা অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা যেতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে খুব সামান্য উপসর্গ বা কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
তাই নিজের স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় নতুন কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
বুকব্যথা হলেই হৃদরোগ—এমন নয়; কিন্তু বুকব্যথা হলেই তা অবহেলা করাও ঠিক নয়। বিশেষ করে বুকের চাপ বা ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি ভাব, মাথা ঘোরা কিংবা হাত, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ব্যথা থাকলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বিবেচনা করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
বুকব্যথার প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে এবং প্রয়োজনে ইসিজি ও রক্তের পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। তাই বুকের নতুন বা অস্বাভাবিক ব্যথাকে শুধু গ্যাস বা সাধারণ সমস্যা মনে করে চিকিৎসা নিতে দেরি না করাই নিরাপদ।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0