হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব দৈনন্দিন অভ্যাস, সতর্ক হোন এখনই

অস্বাস্থ্যকর খাবার, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অনিয়মিত ঘুমসহ কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সময় থাকতেই অভ্যাস বদলান।

সেপ্টে 16, 2026 - 15:35
 0  1
হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব দৈনন্দিন অভ্যাস, সতর্ক হোন এখনই
হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব দৈনন্দিন অভ্যাস, সতর্ক হোন এখনই

দৈনন্দিন অভ্যাসেই কি বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি?

হৃদরোগকে অনেকেই শুধু বয়স, বংশগত ইতিহাস বা উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিনের জীবনযাপনও হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা, অতিরিক্ত ওজন এবং অনিয়মিত ঘুমের মতো বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ আচরণগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, তামাক ব্যবহার এবং ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ। এসব অভ্যাসের প্রভাব উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত ওজনের মতো সমস্যার মাধ্যমে হৃদ্‌স্বাস্থ্যে পড়তে পারে।

হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে যেসব দৈনন্দিন অভ্যাস

১. অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া

প্রতিদিনের খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকা হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে, আর অতিরিক্ত ক্যালরি ও অস্বাস্থ্যকর খাবার দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তশর্করা ও রক্তের চর্বির মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।

বিশেষ করে নিয়মিত ফাস্টফুড, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত লবণযুক্ত স্ন্যাকস, মিষ্টি পানীয় ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা পরিবর্তনের চেষ্টা করা উচিত। এর পরিবর্তে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস খাদ্যতালিকায় বেশি রাখা যেতে পারে।

২. দীর্ঘসময় বসে থাকা ও ব্যায়াম না করা

শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা হৃদরোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম রক্তচাপ, ওজন ও সামগ্রিক হৃদ্‌স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। বিপরীতে দিনের বড় একটি সময় বসে থাকা এবং প্রায় কোনো শারীরিক কার্যক্রম না করার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।

American Heart Association প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম অথবা ৭৫ মিনিট জোরালো মাত্রার কার্যক্রমের লক্ষ্য রাখার পরামর্শ দেয়। একসঙ্গে দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করতে না পারলেও দৈনন্দিন রুটিনে হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার বা অন্যান্য শারীরিক কার্যক্রম যুক্ত করা যেতে পারে।

৩. ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য ব্যবহার

ধূমপান হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি। তামাক ও নিকোটিন রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন বাড়াতে পারে এবং রক্তনালিকে সংকুচিত করতে পারে। ধূমপান রক্তনালির ক্ষতি ও রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত, যা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

শুধু সরাসরি ধূমপান নয়, পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শও এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ। তাই হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষায় ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য ছাড়ার চেষ্টা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

৪. নিয়মিত কম ঘুমানো

ঘুমকে অনেক সময় হৃদ্‌স্বাস্থ্যের অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কিন্তু পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। American Heart Association-এর Life’s Essential 8-এর অন্যতম উপাদান হলো স্বাস্থ্যকর ঘুম; বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের প্রতি রাতে ৭–৯ ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখা উচিত।

নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি বা নিম্নমানের ঘুম উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই প্রতিদিন রাত জাগা, অনিয়মিত সময়ে ঘুমানো এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম না নেওয়ার অভ্যাস থাকলে তা পরিবর্তনের চেষ্টা করা প্রয়োজন।

৫. অতিরিক্ত ওজন ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন

অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মতো হৃদরোগের ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সমন্বয়ে ওজন বাড়তে পারে।

ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর বা দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় অস্বাস্থ্যকর ডায়েট অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। বরং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পরিমিত খাবার এবং পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখার দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

৬. নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তশর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা না করা

উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো অনেক ঝুঁকি দীর্ঘসময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। তাই শুধু শরীরে সমস্যা অনুভব হলেই পরীক্ষা করার পরিবর্তে বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

American Heart Association হৃদ্‌স্বাস্থ্য মূল্যায়নে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, নিকোটিন এড়িয়ে চলা, ঘুম, ওজন, রক্তের চর্বি, রক্তশর্করা এবং রক্তচাপ—এই আটটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়।

আজ থেকেই কোন অভ্যাসগুলো বদলাবেন?

  • খাবারে অতিরিক্ত লবণ কমান।
  • প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি ও ফলের পরিমাণ বাড়ান।
  • নিয়মিত হাঁটা বা শারীরিক কার্যক্রমের অভ্যাস করুন।
  • ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য থেকে দূরে থাকুন।
  • প্রতি রাতে পর্যাপ্ত ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন।
  • অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তশর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করুন।
  • অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিমাণ কমান।

শুধু একটি অভ্যাস বদলালেই কি ঝুঁকি কমে?

হৃদরোগের ঝুঁকি সাধারণত একাধিক বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই শুধু একটি অভ্যাস পরিবর্তনের পাশাপাশি সামগ্রিক জীবনযাপনেও পরিবর্তন আনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—ধূমপান বন্ধ করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন হতে পারে।

তবে সবার ঝুঁকি এক নয়। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হয়। তাই ব্যক্তিগত ঝুঁকি বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

বুকব্যথা হলে অবহেলা নয়

দৈনন্দিন অভ্যাস পরিবর্তনের পাশাপাশি হৃদরোগের সম্ভাব্য লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকাও জরুরি। বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, মাথা ঘোরা, বমিভাব অথবা ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে এবং হৃদ্‌পেশির ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

হৃদরোগের সব ঝুঁকি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং পরিবর্তনযোগ্য। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, তামাক বর্জন, পর্যাপ্ত ঘুম এবং রক্তচাপ, রক্তশর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

তাই বড় কোনো পরিবর্তনের অপেক্ষা না করে আজ থেকেই ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখিত দুঃখিত 0
ওয়াউ ওয়াউ 0
admin mediscript (Medi+Script) is dedicated to advancing health awareness, medical education, and community well-being. Our organization serves as a vibrant platform where healthcare knowledge meets daily living, aiming to inspire hope, happiness, and a healthier future for all. Our mission is to empower individuals, families, and communities with reliable, up-to-date medical information and research. We are committed to supporting both the public and healthcare professionals with educational resources that foster informed decision-making and promote wellness. By bridging modern medical science with everyday life, mediscript inspires people to embrace healthier habits, seek new knowledge, and pursue happiness through holistic well-being. Together, we are building a brighter, more hopeful future—one script at a time.