হার্টের রোগ বাড়ছে কেন? বিশেষজ্ঞদের নতুন সতর্কবার্তা
অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও কম শারীরিক পরিশ্রম হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সচেতনতাই হতে পারে বড় প্রতিরোধ।
হৃদ্রোগকে একসময় বয়স্ক মানুষের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বর্তমান বাস্তবতায় এটি আর শুধু বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত রোগ নয়। পরিবর্তিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন ঝুঁকির কারণে হৃদ্রোগের আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে দৈনন্দিন জীবনে দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকা হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
হৃদ্রোগ বলতে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির বিভিন্ন রোগকে বোঝায়। এর মধ্যে করোনারি হার্ট ডিজিজ, হার্ট অ্যাটাক, হৃদ্যন্ত্রের দুর্বলতা এবং স্ট্রোকের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন রক্তনালির সমস্যা উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রেই এসব রোগ দীর্ঘ সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরে বিকাশ লাভ করতে পারে। ফলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বড় ঝুঁকি
অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, ভাজাপোড়া খাবার এবং অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার ওজন বৃদ্ধি এবং রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম ও স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবারকে খাদ্যতালিকায় পরিমিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি খাবারের পরিমাণ এবং নিয়মিত খাদ্য গ্রহণের অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের প্রভাব
উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। একইভাবে দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রক্তনালির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সমস্যা হলো, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের শুরুতে অনেক মানুষের উল্লেখযোগ্য কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তাই শুধু শরীরে কোনো সমস্যা অনুভূত হচ্ছে কি না, তার ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজ এবং কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ধূমপান ও তামাকের ভয়াবহ প্রভাব
ধূমপান হৃদ্রোগের একটি সুপরিচিত ঝুঁকিপূর্ণ কারণ। তামাকের ধোঁয়ার বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান রক্তনালি ও হৃদ্যন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে এবং হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শুধু সক্রিয় ধূমপান নয়, দীর্ঘ সময় পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
হৃদ্স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ধূমপান ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্য থেকে দূরে থাকা তাই গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। যারা ধূমপান করেন, তাদের জন্য চিকিৎসকের সহায়তায় ধূমপান ছাড়ার পরিকল্পনা করা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়াও উদ্বেগের কারণ
আধুনিক জীবনে কর্মক্ষেত্র, পড়াশোনা ও বিনোদনের বড় একটি অংশ এখন বসে বা স্ক্রিনের সামনে কাটে। দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকা এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভাব ওজন বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ ও বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার বা অন্যান্য উপযুক্ত শারীরিক কর্মকাণ্ড নিয়মিত করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে যাদের আগে থেকেই হৃদ্রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তারা নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মানসিক চাপ ও ঘুমের গুরুত্ব
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুম এবং বিশ্রামের ঘাটতিও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপের সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, ধূমপান বা শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো অভ্যাস যুক্ত হলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তাই হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষায় শুধু খাবার বা ব্যায়ামের দিকে নজর দিলেই হবে না। পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর দৈনন্দিন রুটিন গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ চিনুন
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুকের মাঝখানে চাপ, চেপে ধরা বা অস্বস্তি, যা কয়েক মিনিট স্থায়ী হতে পারে বা আসা-যাওয়া করতে পারে—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা অথবা ব্যথা বাহু, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে লক্ষণ সবসময় প্রচলিত ধরনের নাও হতে পারে। তাই সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
ঝুঁকি কমাতে কী করা যায়?
- নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজ ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা।
- ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য পরিহার করা।
- অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানো।
- শাকসবজি, ফল ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা।
- নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভ্যাস গড়ে তোলা।
- স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করা।
- পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়া।
- পরিবারে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা।
সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
হৃদ্রোগের অনেক ঝুঁকির কারণ জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বয়স বা বংশগত ঝুঁকি পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ওজন এবং অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো অনেক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তাই হৃদ্রোগ প্রতিরোধে শুধু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার পরিবর্তে আগে থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। বুকব্যথা বা হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা দিলে ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0