বিশ্বে পোলিও নির্মূলের পথে নতুন বাধা: WHO-এর জরুরি সতর্কতা

পোলিও নির্মূলের পথে অগ্রগতি থাকলেও অর্থায়ন সংকট, সংঘাত ও টিকাদানের ঘাটতিতে আন্তর্জাতিক বিস্তারের ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে সতর্ক করেছে WHO।

সেপ্টে 11, 2026 - 14:58
 0  1
বিশ্বে পোলিও নির্মূলের পথে নতুন বাধা: WHO-এর জরুরি সতর্কতা
পোলিও নির্মূলের পথে অগ্রগতি থাকলেও অর্থায়ন সংকট, সংঘাত ও টিকাদানের ঘাটতিতে আন্তর্জাতিক বিস্তারের ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে সতর্ক করেছে WHO।

পোলিও নির্মূলের লক্ষ্য অর্জনে নতুন উদ্বেগ

বিশ্ব থেকে পোলিও নির্মূলের পথে গত কয়েক দশকে অসাধারণ অগ্রগতি হলেও শেষ ধাপটি এখনো কঠিন হয়ে উঠছে। রোগটির আন্তর্জাতিক বিস্তার ঠেকাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) আবারও জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। অর্থায়নের ঘাটতি, যুদ্ধ ও নিরাপত্তাহীনতা, কম টিকাদান কভারেজ, দুর্গম এলাকায় শিশুদের কাছে পৌঁছাতে না পারা এবং সীমান্তপারের মানুষের চলাচল—সব মিলিয়ে পোলিও নির্মূল কর্মসূচির সামনে নতুন করে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

WHO-এর পোলিওভাইরাস বিষয়ক জরুরি কমিটি ২০২৬ সালের আগস্টে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, পোলিওভাইরাসের আন্তর্জাতিক বিস্তারের ঝুঁকি এখনো জনস্বাস্থ্যের জন্য আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জরুরি অবস্থা বা Public Health Emergency of International Concern (PHEIC) হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে “pandemic emergency” হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তান এখনো মূল ঝুঁকিতে

বর্তমানে বন্য পোলিওভাইরাস টাইপ-১ (WPV1) সংক্রমণ ভৌগোলিকভাবে মূলত আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে সীমাবদ্ধ রয়েছে। WHO-এর সর্বশেষ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে আফগানিস্তানে তিনটি এবং পাকিস্তানে একটি WPV1 আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। একই সঙ্গে আগের বছরের সংক্রমণের ধারাবাহিকতাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

বিশেষ করে দক্ষিণ আফগানিস্তান, পাকিস্তানের দক্ষিণ খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং করাচি অঞ্চলে ভাইরাসের স্থায়ী সংক্রমণ নিয়ে WHO উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব এলাকায় টিকাদান কর্মসূচির মান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং শিশুদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়েছে।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে WHO পোলিও নির্মূলের ক্ষেত্রে একটি একক মহামারিবিদ্যাগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করছে। কারণ দুই দেশের সীমান্ত দিয়ে মানুষের নিয়মিত চলাচল থাকায় এক দেশের ভাইরাস অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

টিকা না পাওয়া শিশুরাই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা

পোলিও প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। কিন্তু সংঘাতপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় অনেক শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোথাও নিরাপত্তাজনিত কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা পৌঁছাতে পারছেন না, আবার কোথাও স্থানীয় মানুষের অনীহা, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা বা চলমান বাস্তুচ্যুতির কারণে টিকাদান অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে।

WHO জানিয়েছে, কম রুটিন টিকাদান কভারেজ এবং বিপুলসংখ্যক শূন্য-ডোজ বা অপর্যাপ্তভাবে টিকাপ্রাপ্ত শিশু পোলিওভাইরাসের বিস্তারের জন্য একটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। কোনো এলাকায় জনসংখ্যার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে বাইরে থেকে ভাইরাস প্রবেশের পর দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ভ্যাকসিন-ডেরাইভড পোলিওভাইরাসও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

পোলিওর ক্ষেত্রে শুধু বন্য ভাইরাসই নয়, circulating vaccine-derived poliovirus বা টিকা-উৎপন্ন পরিবর্তিত পোলিওভাইরাসও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে cVDPV2 বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণ অব্যাহত রেখেছে।

WHO-এর মতে, ২০২৬ সালে শনাক্ত হওয়া ১৩টি cVDPV2 emergence আগের বছরের ধারাবাহিকতা থেকে এসেছে। নতুন করে ২০২৬ সালে কোনো cVDPV2 emergence শনাক্ত হয়নি—এটি কিছুটা ইতিবাচক দিক। তবে বিদ্যমান সংক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।

আফ্রিকার লেক চাদ অববাহিকা এবং হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে cVDPV2 সংক্রমণ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে। ইয়েমেনেও বিপুলসংখ্যক পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু টিকার বাইরে রয়েছে বলে WHO জানিয়েছে। সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে এসব এলাকায় সময়মতো টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করা কঠিন হচ্ছে।

অর্থায়ন সংকটেও চাপ বাড়ছে

পোলিও নির্মূল কর্মসূচির জন্য শুধু টিকা থাকলেই হয় না। প্রয়োজন রোগ শনাক্তকরণ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, পরিবেশগত নজরদারি, স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবহন এবং দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম। এসব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন অপরিহার্য।

কিন্তু WHO-এর জরুরি কমিটি জানিয়েছে, পোলিও নির্মূল কর্মসূচিতে বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি রোগ শনাক্তকরণ ও নজরদারি থেকে শুরু করে টিকাদান কার্যক্রম পর্যন্ত পুরো কর্মসূচির ওপর চাপ তৈরি করছে।

অর্থের ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কোনো এলাকায় ভাইরাসের উপস্থিতি সময়মতো শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। ফলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর তা শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। পোলিও নির্মূলের শেষ পর্যায়ে এমন কোনো দুর্বলতা বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।

সীমান্তপারের সংক্রমণ বড় চ্যালেঞ্জ

পোলিওভাইরাস আন্তর্জাতিক সীমান্ত মানে না। একটি দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এলেও আক্রান্ত ব্যক্তি বা ভাইরাসের মাধ্যমে অন্য দেশে তা আবার প্রবেশ করতে পারে। WHO-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে সীমান্তপারের চলাচলকে আন্তর্জাতিক বিস্তারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পাশাপাশি আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলেও মানুষের চলাচল এবং দুর্বল টিকাদান ব্যবস্থার কারণে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই শুধু একটি দেশের ভেতরে টিকাদান বাড়ালেই হবে না; প্রতিবেশী দেশগুলোকেও সমন্বিতভাবে নজরদারি ও টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

পোলিও নির্মূল কি এখনো সম্ভব?

উদ্বেগ থাকলেও বিশ্বব্যাপী পোলিও নির্মূলের অগ্রগতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালের তুলনায় বিশ্বে পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা ৯৯ শতাংশেরও বেশি কমেছে। কয়েক দশকের টিকাদান কর্মসূচির ফলে বন্য পোলিওভাইরাসের বিস্তার বর্তমানে মাত্র দুটি দেশে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

তবে একটি দেশ থেকে পোলিও পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেলেও অন্য কোনো এলাকায় ভাইরাস থাকলে পুনরায় সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়। তাই নির্মূলের শেষ পর্যায়ে প্রতিটি সংক্রমণ শনাক্ত করা এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

WHO-এর জরুরি বার্তা

WHO সব দেশকে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা, দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার প্রতিটি শিশুর কাছে টিকা পৌঁছে দেওয়া এবং পোলিওভাইরাসের নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে সীমান্তপারের সমন্বয় জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

WHO আরও বলেছে, পোলিও নির্মূলের জন্য শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং দাতাদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষ করে অর্থায়ন ঘাটতি পূরণ না হলে এখন পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

শেষ কথা

পোলিও নির্মূলের লক্ষ্য থেকে বিশ্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কাছাকাছি। কিন্তু শেষ কয়েকটি সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, টিকার ঘাটতি এবং অর্থায়ন সংকট একসঙ্গে কাজ করলে বহু বছরের অগ্রগতি পিছিয়ে যেতে পারে।

তাই পোলিওকে ইতিহাসের রোগে পরিণত করতে হলে টিকাদান কর্মসূচিতে কোনো শূন্যস্থান রাখা যাবে না। প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বজায় রাখাই হতে পারে বিশ্বব্যাপী পোলিও নির্মূলের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখিত দুঃখিত 0
ওয়াউ ওয়াউ 0
admin mediscript (Medi+Script) is dedicated to advancing health awareness, medical education, and community well-being. Our organization serves as a vibrant platform where healthcare knowledge meets daily living, aiming to inspire hope, happiness, and a healthier future for all. Our mission is to empower individuals, families, and communities with reliable, up-to-date medical information and research. We are committed to supporting both the public and healthcare professionals with educational resources that foster informed decision-making and promote wellness. By bridging modern medical science with everyday life, mediscript inspires people to embrace healthier habits, seek new knowledge, and pursue happiness through holistic well-being. Together, we are building a brighter, more hopeful future—one script at a time.