নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকি: পুরুষদের তুলনায় কোন বিষয়গুলো আলাদা?
নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকিতে মেনোপজ, গর্ভাবস্থার জটিলতা ও কিছু বিশেষ শারীরিক কারণ ভূমিকা রাখে। হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গও পুরুষদের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে।
নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকি কেন আলাদা?
হৃদরোগকে অনেক সময় পুরুষদের স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বেশি দেখা হলেও বাস্তবে নারীদের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি। তবে নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার পেছনে কিছু বিষয় পুরুষদের তুলনায় আলাদা। বয়স, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও পারিবারিক ইতিহাস—এসব প্রচলিত ঝুঁকির পাশাপাশি নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার কিছু জটিলতা, মেনোপজ এবং কিছু হরমোন ও প্রদাহজনিত রোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউট (NHLBI) বলছে, নারীদের সাধারণত পুরুষদের তুলনায় প্রায় ১০ বছর পরে হৃদরোগ দেখা দেয়। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে, বিশেষ করে মেনোপজের পর, নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
১. মেনোপজের পর ঝুঁকি বাড়তে পারে
নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকির ক্ষেত্রে মেনোপজ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যায়। এই হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার মতো হৃদরোগের ঝুঁকির বিভিন্ন সূচকে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
২০২৬ সালের একটি আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিয়মিত মাসিক চলা নারীদের তুলনায় পেরিমেনোপজ বা মেনোপজে প্রবেশের সময় নারীদের সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্য সূচক কম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল। বিশেষ করে কোলেস্টেরল ও রক্তে শর্করার মাত্রার পরিবর্তন এতে ভূমিকা রেখেছে।
এ কারণে মেনোপজের সময় নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা এবং খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের দিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
২. গর্ভাবস্থার জটিলতা ভবিষ্যতের হৃদরোগের সংকেত হতে পারে
নারীদের হৃদরোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো—গর্ভাবস্থার ইতিহাসও ভবিষ্যতের হৃদ্স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া, গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, সময়ের আগে সন্তান প্রসব এবং গর্ভাবস্থার কিছু অন্যান্য জটিলতা পরবর্তী জীবনে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ বা প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ইতিহাস থাকলে সন্তান জন্মের পরও রক্তচাপ ও অন্যান্য হৃদরোগের ঝুঁকির বিষয়গুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। AHA-এর তথ্য অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ হওয়া নারীদের পরবর্তী কয়েক বছরে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে।
তাই গর্ভাবস্থার জটিলতাকে শুধু সেই সময়ের সমস্যা হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ হৃদ্স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৩. হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ সবসময় একই রকম নাও হতে পারে
পুরুষ ও নারী—উভয়ের হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে বুকের ব্যথা বা অস্বস্তি সাধারণ উপসর্গ। তবে নারীদের ক্ষেত্রে বুকের ব্যথার পাশাপাশি আরও কিছু উপসর্গ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যেতে পারে। এর মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বমি বমি ভাব বা বমি, মাথা ঘোরা এবং পিঠ, কাঁধ, ঘাড় বা চোয়ালে ব্যথা থাকতে পারে।
এ কারণে শুধু তীব্র বুকব্যথা না থাকলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা নেই—এমন ধারণা ভুল হতে পারে। বিশেষ করে হঠাৎ অস্বাভাবিক দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব বা শরীরের ওপরের অংশে অস্বাভাবিক ব্যথার সঙ্গে বুকের অস্বস্তি থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
৪. নারীদের কিছু হৃদরোগের ধরন শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে
নারীদের হার্ট অ্যাটাকের কারণও সবসময় পুরুষদের মতো হয় না। NHLBI-এর তথ্য অনুযায়ী, নারীদের এমন কিছু হার্ট অ্যাটাক হতে পারে যেগুলোর পেছনে প্রচলিত করোনারি ধমনির রোগ সরাসরি কারণ নয়। এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে কঠিন হতে পারে।
AHA-এর তথ্য অনুযায়ী, নারীদের ক্ষেত্রে করোনারি ধমনির প্লাকের ধরন ও অবস্থানেও কিছু পার্থক্য দেখা যেতে পারে। প্লাক ক্ষয় বা অন্য ধরনের ধমনিগত সমস্যাও হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
৫. ধূমপান ও ডায়াবেটিসের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ
ধূমপান নারী-পুরুষ উভয়ের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে কিছু পরিস্থিতিতে নারীদের জন্য এর প্রভাব আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে জন্মনিয়ন্ত্রণের কিছু বড়ি ব্যবহারকারী নারীদের ক্ষেত্রে ধূমপান হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ডায়াবেটিস থাকলেও ধূমপানের সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকি আরও বাড়ে।
এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো সাধারণ ঝুঁকিগুলোও নারীদের হৃদরোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বয়স কম হলেও এসব বিষয়কে অবহেলা করা উচিত নয়।
৬. কিছু হরমোন ও প্রদাহজনিত রোগও বিবেচনায় আসে
নারীদের কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত অবস্থাও ভবিষ্যতের হৃদরোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। AHA-এর পর্যালোচনায় অল্প বয়সে মেনোপজ, এন্ডোমেট্রিওসিস এবং পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের মতো অবস্থার সঙ্গে হৃদ্স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া লুপাস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো কিছু অটোইমিউন রোগও কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে এসব অবস্থার উপস্থিতি মানেই কোনো নারীর হৃদরোগ হবেই—এমন নয়। এগুলো ব্যক্তিগত ঝুঁকি মূল্যায়নের সময় চিকিৎসকের বিবেচনায় নেওয়ার মতো বিষয়।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে কী করা জরুরি?
নারীদের হৃদরোগ প্রতিরোধে বয়স ও জীবনপর্ব অনুযায়ী ঝুঁকি শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মেনোপজের সময় বা গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া কিংবা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত।
- নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করুন।
- ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য এড়িয়ে চলুন।
- নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন।
- সবজি, ফল, পূর্ণশস্য ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনসমৃদ্ধ সুষম খাবার খান।
- অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত করুন।
- পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দিন।
- গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস হলে চিকিৎসকের নিয়মিত ফলোআপে থাকুন।
- হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাব্য উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন।
সচেতনতার মূল বার্তা
নারী ও পুরুষ উভয়ের হৃদরোগের অনেক সাধারণ ঝুঁকি একই হলেও নারীদের ক্ষেত্রে জীবনপর্ব ও প্রজননস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু অতিরিক্ত বিষয় বিবেচনা করতে হয়। গর্ভাবস্থার জটিলতা, মেনোপজ, কিছু হরমোন-সম্পর্কিত ও প্রদাহজনিত রোগ এবং হার্ট অ্যাটাকের তুলনামূলক ভিন্ন উপসর্গ—এসব কারণে নারীদের হৃদ্স্বাস্থ্য মূল্যায়নে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হৃদরোগকে শুধু বয়স্ক পুরুষদের রোগ হিসেবে না দেখা। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া—নারীদের হৃদ্স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0