হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে দৈনন্দিন কোন অভ্যাসগুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
সুস্থ খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত ঘুম ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হৃদরোগ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। তবে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রেই জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে কমানো সম্ভব। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ রক্তশর্করা ও কোলেস্টেরলসহ বিভিন্ন বিষয় দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, তামাক ব্যবহার এবং ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ আচরণগত ঝুঁকি। এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখলে হৃদ্স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যায়।
১. খাবারের মানের দিকে নজর দিন
হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম, বীজ এবং স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের মতো পুষ্টিকর খাবার রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, সম্পৃক্ত চর্বি এবং শিল্পজাত ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার কমানো উচিত।
বিশেষ করে অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে, আর দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই খাবারে অতিরিক্ত লবণ যোগ করার অভ্যাস কমানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত লবণযুক্ত প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারও সীমিত করা ভালো।
২. নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন
শুধু ব্যায়ামের জন্য আলাদা সময় বের করাই নয়, সারাদিন যতটা সম্ভব সক্রিয় থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। WHO-এর পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম অথবা ৭৫ মিনিট তীব্র মাত্রার কার্যক্রম করার লক্ষ্য রাখা উচিত। অতিরিক্ত উপকারের জন্য মাঝারি মাত্রার কার্যক্রম সপ্তাহে ৩০০ মিনিট পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।
দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা নিয়মিত শরীরচর্চার মতো কার্যক্রম দৈনন্দিন রুটিনে যুক্ত করা যেতে পারে। দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকার পরিবর্তে মাঝে মাঝে উঠে হাঁটাচলা করাও ভালো অভ্যাস।
৩. ধূমপান ও তামাক থেকে দূরে থাকুন
ধূমপান হৃদরোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি। শুধু ধূমপানকারী ব্যক্তিই নয়, পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শেও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ধূমপান না করা এবং ধূমপান করলে তা ছাড়ার চেষ্টা করা হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ধূমপান ছাড়ার ক্ষেত্রে নিজের চেষ্টার পাশাপাশি চিকিৎসক বা ধূমপান ছাড়ার সহায়তা কার্যক্রমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
৪. পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমান
ঘুমকে শুধু বিশ্রামের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি হৃদ্স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। American Heart Association-এর Life’s Essential 8 অনুযায়ী, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের প্রতি রাতে গড়ে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখা উচিত। পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুম হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদিন ঘুমানোর ও জাগার সময় যতটা সম্ভব নিয়মিত রাখা, রাতে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার কমানো এবং আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ তৈরি করা ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে।
৫. রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা করুন
উচ্চ রক্তচাপ অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ হৃদরোগ, স্ট্রোক ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য ঝুঁকির ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তচাপ বেশি পাওয়া গেলে নিজে থেকে ওষুধ শুরু বা বন্ধ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। জীবনযাপনের পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
৬. ওজন ও কোমরের মাপের দিকে নজর রাখুন
অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মতো হৃদরোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে খাবারের পরিমাণ ও মান এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম—দুই দিকেই নজর দেওয়া প্রয়োজন।
ওজন কমানোর প্রয়োজন থাকলে খুব দ্রুত ওজন কমানোর পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে অনুসরণ করা সম্ভব এমন স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৭. রক্তে কোলেস্টেরল ও শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন
রক্তে অতিরিক্ত ক্ষতিকর কোলেস্টেরল এবং অনিয়ন্ত্রিত রক্তশর্করা হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। American Heart Association হৃদ্স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কোলেস্টেরল, রক্তশর্করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেয়।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল বা পরিবারের হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা উচিত।
৮. অতিরিক্ত অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন
ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ হৃদরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। WHO হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষায় ক্ষতিকর মাত্রায় অ্যালকোহল ব্যবহার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়।
একসঙ্গে সব পরিবর্তন নয়, নিয়মিত অভ্যাসই গুরুত্বপূর্ণ
হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে একটি মাত্র অভ্যাসের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক জীবনযাপনকে স্বাস্থ্যকর করার চেষ্টা করা প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, তামাক এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং রক্তচাপ, রক্তশর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। American Heart Association-এর Life’s Essential 8-এও এই বিষয়গুলোকে হৃদ্স্বাস্থ্যের মূল সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?
জীবনযাপনের পরিবর্তন হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হলেও এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়। বুকের চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, ঠান্ডা ঘাম, মাথা ঘোরা বা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া ব্যথার মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
একইভাবে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য কোনো একটি ‘জাদুকরী’ অভ্যাস নেই। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত—কী খাবেন, কতটা হাঁটবেন, ধূমপান করবেন কি না, কতক্ষণ ঘুমাবেন এবং নিজের রক্তচাপ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে কতটা সচেতন থাকবেন—দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0