বিশ্বজুড়ে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

টিকাদান শিশুদের হাম, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও অন্যান্য প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। বিশ্বজুড়ে শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায় এটি অন্যতম কার্যকর উপায়।

সেপ্টে 10, 2026 - 14:55
 0  1
বিশ্বজুড়ে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্য, শিশুদের টিকা, টিকা কর্মসূচি, সংক্রামক রোগ, হাম, পোলিও, Immunization, Vaccination, Child Health

একটি শিশুর জন্মের পর তার সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পুষ্টি, পরিচর্যা ও চিকিৎসার পাশাপাশি সময়মতো টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিকা শিশুর শরীরকে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে আগেভাগে প্রস্তুত করে এবং গুরুতর অসুস্থতা, অক্ষমতা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, টিকাদান বিশ্বের অন্যতম সফল জনস্বাস্থ্য উদ্যোগগুলোর একটি। গত ৫০ বছরে টিকাদানের মাধ্যমে আনুমানিক ১৫ কোটি ৪০ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করা হয়েছে, যাদের বড় অংশই শিশু।

কেন শিশুদের জন্য টিকাদান এত গুরুত্বপূর্ণ?

শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও বিকাশমান থাকে। জন্মের পর মায়ের কাছ থেকে পাওয়া কিছু অ্যান্টিবডি শিশুকে সাময়িক সুরক্ষা দিলেও এই সুরক্ষা দীর্ঘস্থায়ী নয়। তাই শিশুর বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় টিকা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। WHO বলছে, শিশুদের অনেক টিকা জীবাণুর সংস্পর্শে আসার আগেই দেওয়ার জন্য নির্ধারিত হয়, যাতে রোগের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে।

টিকা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট জীবাণু চিনতে শেখায়। পরবর্তীতে সেই জীবাণুর সংস্পর্শে এলে শরীর দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এর ফলে অনেক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে এবং আক্রান্ত হলেও রোগের তীব্রতা কম হতে পারে।

কোন কোন রোগ থেকে শিশুদের সুরক্ষা দেয় টিকা?

দেশভেদে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও বিশ্বজুড়ে শিশুদের জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিকা সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, হুপিং কাশি, পোলিও, হাম, রুবেলা, হেপাটাইটিস বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি (Hib), নিউমোকক্কাল রোগ এবং রোটাভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা। কিছু দেশে স্থানীয় রোগের ঝুঁকি অনুযায়ী আরও কিছু টিকা জাতীয় কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত থাকে।

এসব রোগের কিছু নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস, পক্ষাঘাত, গুরুতর পানিশূন্যতা বা অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। সময়মতো টিকা নেওয়া এসব ঝুঁকি কমানোর একটি কার্যকর উপায়।

হাম কেন টিকাদানের গুরুত্ব বোঝায়?

হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। কোনো জনগোষ্ঠীতে টিকাদানের হার কমে গেলে খুব দ্রুত রোগটির বিস্তার ঘটতে পারে। এ কারণে WHO হামকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করে—কারণ হাম সংক্রমণ কোনো এলাকায় শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ২১ মিলিয়ন শিশু নিয়মিত হাম প্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজ পায়নি। পর্যাপ্ত টিকাদান না হলে হামসহ টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাব আবার বাড়তে পারে।

টিকাদান শুধু একজন শিশুকেই সুরক্ষা দেয় না

টিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাগুলোর একটি হলো এটি ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি সমাজের অন্য মানুষদেরও পরোক্ষভাবে সুরক্ষা দিতে পারে। যখন একটি জনগোষ্ঠীর বড় অংশ কোনো সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষিত থাকে, তখন জীবাণুর ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে যায়। এর ফলে টিকা নিতে না পারা বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তারাও কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারেন।

অন্যদিকে, টিকাদানের হার কমে গেলে রোগের বিস্তারের সুযোগ বাড়ে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল বা স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে।

বিশ্বে এখনো কোটি কোটি শিশু টিকার আওতার বাইরে

টিকাদানে বৈশ্বিক অগ্রগতি হলেও সব শিশু সমানভাবে এই সুরক্ষা পাচ্ছে না। WHO-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন শিশু কোনো টিকাই পায়নি। এ ধরনের শিশুদের ‘জিরো-ডোজ’ শিশু বলা হয়।

২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ৮৫ শতাংশ শিশু ডিপথেরিয়া, টিটেনাস ও হুপিং কাশি প্রতিরোধী টিকার তিনটি ডোজ সম্পন্ন করেছে। অর্থাৎ অধিকাংশ শিশু টিকাদানের আওতায় এলেও এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু পূর্ণ টিকা পায়নি। WHO ও UNICEF বলছে, সংঘাত, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্বলতা, অর্থনৈতিক সমস্যা এবং টিকা নিয়ে দ্বিধা বা ভুল তথ্যের কারণে অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

টিকা না দিলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে?

কোনো শিশু প্রয়োজনীয় টিকা না পেলে সংশ্লিষ্ট সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিছু রোগের ক্ষেত্রে জটিলতা খুব গুরুতর হতে পারে। যেমন পোলিও স্থায়ী পক্ষাঘাত সৃষ্টি করতে পারে, হাম নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে এবং ডিপথেরিয়া শ্বাসনালিতে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

এ ছাড়া কোনো এলাকায় টিকাদানের হার কমে গেলে আগে নিয়ন্ত্রণে থাকা রোগ আবার ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন অঞ্চলে হামসহ টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাব এই ঝুঁকির বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে।

টিকার সময়সূচি মেনে চলা কেন জরুরি?

শিশুর প্রতিটি টিকার নির্দিষ্ট সময়সূচি থাকে। এই সময় নির্ধারণ করা হয় শিশুর বয়স, রোগের ঝুঁকি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বিকাশ এবং টিকার কার্যকারিতা বিবেচনা করে। তাই একটি টিকা নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে নেওয়া হলে শিশুটি প্রয়োজনীয় সময়টুকু পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া কাটাতে পারে।

WHO-এর মতে, বিশ্বজুড়ে একক কোনো টিকাদান সূচি নেই। প্রতিটি দেশের রোগের ধরন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় টিকাদান সূচি নির্ধারিত হয়। তাই অভিভাবকদের নিজ দেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুসরণ করা উচিত।

কোনো টিকা বাদ পড়ে গেলে কী করবেন?

শিশুর কোনো নির্ধারিত টিকা সময়মতো দেওয়া না হলে আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে দ্রুত স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। শিশুর টিকা কার্ড বা আগের টিকাদানের তথ্য সঙ্গে রাখলে স্বাস্থ্যকর্মী পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে পারবেন। নিজের সিদ্ধান্তে টিকার ডোজ বাদ দেওয়া বা সূচি পরিবর্তন করা উচিত নয়।

টিকা কি নিরাপদ?

অনুমোদিত টিকা ব্যবহারের আগে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করা হয় এবং ব্যবহারের পরও এর নিরাপত্তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। কিছু টিকার পর সাময়িক জ্বর, ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা বা অস্বস্তির মতো সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। গুরুতর প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও কোনো শিশুর বিশেষ স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকলে টিকা দেওয়ার আগে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

টিকাদান ও শিশুর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য

শিশুকে টিকা দেওয়ার সুফল শুধু একটি নির্দিষ্ট রোগ প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গুরুতর সংক্রামক রোগ থেকে শিশুকে সুরক্ষিত রাখলে তার সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, স্কুলে যাওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ বাড়ে। টিকাদান পরিবারকে চিকিৎসা ব্যয় ও গুরুতর অসুস্থতার চাপ থেকেও রক্ষা করতে সাহায্য করে। UNICEF টিকাদানকে শিশুস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম সাশ্রয়ী ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

অভিভাবকদের কী মনে রাখা উচিত?

  • শিশুর জন্মের পর থেকেই জাতীয় টিকাদান সূচি সম্পর্কে জানুন।
  • নির্ধারিত বয়সে প্রতিটি প্রয়োজনীয় টিকা দেওয়ার চেষ্টা করুন।
  • শিশুর টিকা কার্ড নিরাপদে সংরক্ষণ করুন।
  • কোনো ডোজ বাদ পড়লে স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  • টিকা সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যাচাইহীন তথ্যের ওপর নির্ভর করবেন না।
  • শিশুর বিশেষ কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকলে টিকা দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শেষ কথা

টিকাদান শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। গত কয়েক দশকে টিকার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক শিশুর জীবন রক্ষা হয়েছে এবং পোলিও ও হামসহ বহু সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে প্রতিটি শিশুকে সময়মতো প্রয়োজনীয় টিকার আওতায় আনা জরুরি।

২০২৫ সালেও বিশ্বে ১৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন শিশু কোনো টিকা পায়নি—যা দেখিয়ে দেয়, টিকাদানের সুযোগ সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া এখনো একটি বড় বৈশ্বিক স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। তাই অভিভাবক, স্বাস্থ্যকর্মী ও নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিটি শিশুর টিকাদান নিশ্চিত করাই হতে পারে রোগ প্রতিরোধ ও সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখিত দুঃখিত 0
ওয়াউ ওয়াউ 0
admin mediscript (Medi+Script) is dedicated to advancing health awareness, medical education, and community well-being. Our organization serves as a vibrant platform where healthcare knowledge meets daily living, aiming to inspire hope, happiness, and a healthier future for all. Our mission is to empower individuals, families, and communities with reliable, up-to-date medical information and research. We are committed to supporting both the public and healthcare professionals with educational resources that foster informed decision-making and promote wellness. By bridging modern medical science with everyday life, mediscript inspires people to embrace healthier habits, seek new knowledge, and pursue happiness through holistic well-being. Together, we are building a brighter, more hopeful future—one script at a time.