হার্ট অ্যাটাকের আগে শরীরে যে ৫টি সতর্কসংকেত দেখা দিতে পারে
হার্ট অ্যাটাকের আগে বুকের অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঠান্ডা ঘাম ও বমিভাবের মতো সতর্কসংকেত দেখা দিতে পারে। লক্ষণগুলো অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
হার্ট অ্যাটাকের আগে কি শরীর সতর্ক করে?
হার্ট অ্যাটাক সবসময় হঠাৎ তীব্র বুকব্যথা দিয়ে শুরু হয়—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। American Heart Association ও যুক্তরাষ্ট্রের National Heart, Lung, and Blood Institute (NHLBI)-এর তথ্য অনুযায়ী, কিছু হার্ট অ্যাটাক ধীরে ধীরে হালকা অস্বস্তি বা অন্যান্য উপসর্গ দিয়ে শুরু হতে পারে। এসব উপসর্গ কয়েক মিনিট স্থায়ী হতে পারে, আবার কমে গিয়ে পরে ফিরে আসতেও পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—হার্ট অ্যাটাকের আগে সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের সতর্কসংকেত দেখা যায় না। কারও উপসর্গ খুব স্পষ্ট হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে লক্ষণ তুলনামূলকভাবে মৃদু হতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে খুব কম বা কোনো লক্ষণ ছাড়াও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের ৫টি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত
১. বুকের চাপ, ব্যথা বা অস্বস্তি
হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণগুলোর একটি হলো বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী লাগা, চেপে ধরা, টানটান অনুভূতি বা ব্যথা। অনেক সময় এই অস্বস্তি কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হতে পারে অথবা কিছুক্ষণ পর কমে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারে।
শুধু তীব্র ব্যথাই নয়, বুকের ভেতর অস্বাভাবিক চাপ বা অস্বস্তিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন ধরনের বা স্বাভাবিকের তুলনায় ভিন্ন বুকের অস্বস্তি হলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।
২. অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট
হঠাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি শ্বাসকষ্ট হওয়াও হার্ট অ্যাটাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হতে পারে। এটি বুকের অস্বস্তির সঙ্গে দেখা দিতে পারে, আবার বুকব্যথা ছাড়াও শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
বিশেষ করে বিশ্রামের সময় বা সামান্য কাজের পর অস্বাভাবিকভাবে হাঁপিয়ে যাওয়া, পর্যাপ্ত বাতাস না পাওয়ার অনুভূতি বা শ্বাস নিতে কষ্ট হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৩. অস্বাভাবিক ও হঠাৎ ক্লান্তি
কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অতিরিক্ত ক্লান্তি কখনো কখনো হার্টের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ক্লান্তি হার্ট অ্যাটাকের সময় বা তার আগের সময়ে দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে বুকের ব্যথার পাশাপাশি অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, বমিভাব বা পিঠ-হাতের অস্বস্তির মতো তুলনামূলক কম পরিচিত লক্ষণ দেখা যেতে পারে। তাই শুধু বুকব্যথার অপেক্ষায় থাকা ঠিক নয়।
৪. ঠান্ডা ঘাম, মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগা
অন্য কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ ঠান্ডা ঘাম হওয়া, মাথা হালকা লাগা, মাথা ঘোরা বা দুর্বল হয়ে পড়াও হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ বিশেষ করে বুকের অস্বস্তি বা শ্বাসকষ্টের সঙ্গে থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
শুধু গরম আবহাওয়া, ব্যায়াম বা অন্য কোনো স্বাভাবিক কারণে ঘাম হওয়া এবং অস্বাভাবিক ঠান্ডা ঘাম এক বিষয় নয়। নতুন বা অস্বাভাবিক উপসর্গ হলে নিজে থেকে কারণ নির্ধারণ না করাই নিরাপদ।
৫. বমিভাব, পেটের অস্বস্তি বা শরীরের অন্য অংশে ব্যথা
হার্ট অ্যাটাকের সময় বমিভাব বা বমি হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে ব্যথা বা অস্বস্তি বুক থেকে এক বা দুই হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই ধরনের উপসর্গকে অনেক সময় বদহজম, গ্যাস বা সাধারণ পেশির ব্যথা ভেবে উপেক্ষা করা হয়। কিন্তু বুকের অস্বস্তির সঙ্গে এসব লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সব হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কি একই?
না। মানুষের বয়স, লিঙ্গ, অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং হার্টের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে। কিছু হার্ট অ্যাটাক হঠাৎ ও তীব্রভাবে শুরু হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে লক্ষণ ধীরে ধীরে শুরু হয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে আসা-যাওয়া করতে পারে।
বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিস বা দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তশর্করা থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কখনো কখনো খুব মৃদু উপসর্গ বা প্রায় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এটিকে ‘সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক’ বলা হয়।
কখন জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে?
বুকে নতুন বা অস্বাভাবিক চাপ/ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, মাথা ঘোরা, বমিভাব অথবা হাত, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া অস্বস্তি—বিশেষ করে একাধিক লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে অপেক্ষা করা উচিত নয়। হার্ট অ্যাটাক একটি জীবন-হুমকিপূর্ণ জরুরি অবস্থা এবং দ্রুত চিকিৎসা হৃদ্পেশির ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে স্থানীয় জরুরি চিকিৎসা নম্বরে যোগাযোগ করে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। সম্ভব হলে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পরিবর্তে জরুরি চিকিৎসা পরিবহনের সাহায্য নেওয়া নিরাপদ, কারণ পথে চিকিৎসাকর্মীরা প্রয়োজনীয় সহায়তা শুরু করতে পারেন।
বুকব্যথা মানেই কি হার্ট অ্যাটাক?
না। বুকব্যথা বা বুকের অস্বস্তির অনেক কারণ থাকতে পারে। অ্যাসিড রিফ্লাক্স, পেশির সমস্যা এবং অন্যান্য অবস্থাতেও বুকব্যথা হতে পারে। কিন্তু নিজে থেকে বুকব্যথার কারণ নির্ধারণ করা নিরাপদ নয়। বিশেষ করে ব্যথা নতুন হলে, তীব্র হলে বা অন্যান্য সতর্কসংকেতের সঙ্গে থাকলে দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
সচেতন থাকুন, লক্ষণ অবহেলা করবেন না
হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ ও দ্রুত চিকিৎসার ক্ষেত্রে নিজের শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ। বুকের চাপ বা অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঠান্ডা ঘাম, মাথা ঘোরা বা বমিভাবের মতো উপসর্গকে শুধু গ্যাস বা ক্লান্তি ভেবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা উচিত নয়।
মনে রাখতে হবে, হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং কোনো নির্দিষ্ট পাঁচটি লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে আগে থেকেই দেখা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0