সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর ভয়াবহ রূপ: একদিনে রেকর্ড ১,৮৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি

সেপ্টেম্বরে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। একদিনে রেকর্ড ১,৮৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি ও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সতর্ক থাকার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

সেপ্টে 24, 2026 - 11:09
 0  2
সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর ভয়াবহ রূপ: একদিনে রেকর্ড ১,৮৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি
সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর ভয়াবহ রূপ: একদিনে রেকর্ড ১,৮৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি

সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর ভয়াবহ রূপ: একদিনে রেকর্ড ১,৮৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি

বাংলাদেশে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে নতুন করে ১ হাজার ৮৭২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এক দিনে হাসপাতালে ভর্তির এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালে দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯৫ জনে এবং জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৫ হাজার ৪৯৯।

একদিনে ভর্তির আগের রেকর্ডও ছাড়াল

ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে দৈনিক হাসপাতালে ভর্তির পরিসংখ্যানে। এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর এক দিনে ১ হাজার ৭৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, যা তখন চলতি বছরের সর্বোচ্চ ছিল। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে ১ হাজার ৮৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি হলেন।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ৩৯১ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৯১ জন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৫৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া খুলনা বিভাগে ৩১৬ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮৫ জন, বরিশালে ১৯০ জন, রাজশাহীতে ১৬২ জন, ময়মনসিংহে ১০৫ জন, রংপুরে ৬৭ জন এবং সিলেটে ৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

সেপ্টেম্বরেই বাড়ছে মৃত্যুর চাপ

ডেঙ্গুর সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো সেপ্টেম্বর মাসে মৃত্যুর দ্রুত বৃদ্ধি। ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে ৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা ২০২৬ সালের এখন পর্যন্ত কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ। আগস্টে ডেঙ্গুতে ৪৩ জন মারা গিয়েছিলেন, আর জুলাইয়ে মারা যান ৩৬ জন। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের প্রথম ২২ দিনের মৃত্যুই আগস্ট ও জুলাইয়ের মাসিক মৃত্যুর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।

সর্বশেষ পাঁচ মৃত্যুর মধ্যে দুজন রাজশাহী বিভাগের এবং একজন করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও বরিশাল বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

চলতি বছরে আক্রান্ত ও সুস্থতার হিসাব

২২ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে দেশে মোট ৬৫ হাজার ৪৯৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৬০ হাজার ৫৬০ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেই ১ হাজার ৪৭৭ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড় পেয়েছেন।

তবে পরদিনের DGHS ড্যাশবোর্ডের তথ্যেও পরিস্থিতির ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকার চিত্র পাওয়া যায়। ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৬৭ হাজার ৩৬৭ এবং মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২০১-এ পৌঁছায়; ওই ২৪ ঘণ্টায় আরও ১ হাজার ৮৬৮ জন ভর্তি হন এবং ছয়জনের মৃত্যু হয়।

জ্বর হলেই ডেঙ্গু ধরে নেওয়া ঠিক নয়

ডেঙ্গুর প্রধান উপসর্গ জ্বর হলেও সব জ্বর ডেঙ্গু নয়। ডেঙ্গু হলে জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা বমি এবং কখনও ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। তবে এসব উপসর্গ অন্যান্য রোগেও দেখা যেতে পারে। তাই জ্বর হলে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। রক্ত পরীক্ষা ও রোগীর উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করতে পারেন।

জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে—এমন নয়

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জ্বর কমে যাওয়ার সময়ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। CDC-এর তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুর সংকটপূর্ণ পর্যায় সাধারণত জ্বর শুরু হওয়ার ৩ থেকে ৮ দিনের মধ্যে দেখা দিতে পারে। জ্বর কমে যাওয়ার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সতর্কতার সঙ্গে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

তীব্র পেটব্যথা বা পেটে চাপ দিলে ব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, রক্তবমি, পায়খানায় রক্ত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। গুরুতর ডেঙ্গু দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে এবং এটি একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি।

ডেঙ্গু হলে কোন ওষুধে সতর্কতা প্রয়োজন?

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা, পর্যাপ্ত তরল নিশ্চিত করা এবং জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া। জ্বর ও ব্যথা কমাতে সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো কিছু ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে ডেঙ্গুর সন্দেহ থাকলে এগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

তাই ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ব্যথানাশক বা অন্য কোনো ওষুধ শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু হাসপাতাল নয়, বাড়িতেও নজর জরুরি

ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। বাসাবাড়ি, ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, টব, ড্রাম, টায়ার বা যেসব স্থানে পানি জমতে পারে সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বাংলাদেশে ডেঙ্গুকে এখনও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। মশার প্রজননস্থল কমানো, নজরদারি জোরদার এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ডেঙ্গু রোগীকে মশার কামড় থেকেও রক্ষা করতে হবে

ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অসুস্থ ব্যক্তির রক্তে ভাইরাস থাকাকালে এডিস মশা তাকে কামড়ালে মশাটি ভাইরাস বহন করে অন্য মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই অসুস্থ ব্যক্তিকে মশারির ভেতরে রাখা এবং মশার কামড় এড়ানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সতর্ক থাকার এখনই সময়

একদিনে ১ হাজার ৮৭২ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং সেপ্টেম্বর মাসে মৃত্যুর দ্রুত বৃদ্ধি দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির তীব্রতা স্পষ্ট করছে। যদিও ২০২৩ সালের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের তুলনায় ২০২৬ সালের মোট সংখ্যা এখনও অনেক কম, সাম্প্রতিক দিনগুলোর দ্রুত ঊর্ধ্বগতি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ২০২৩ সালে দেশে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

তাই জ্বরকে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, বিপদসংকেত সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি অপসারণ করা জরুরি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি পর্যায়ের সচেতনতার পাশাপাশি নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ও সমন্বিত জনস্বাস্থ্য উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখিত দুঃখিত 0
ওয়াউ ওয়াউ 0
admin mediscript (Medi+Script) is dedicated to advancing health awareness, medical education, and community well-being. Our organization serves as a vibrant platform where healthcare knowledge meets daily living, aiming to inspire hope, happiness, and a healthier future for all. Our mission is to empower individuals, families, and communities with reliable, up-to-date medical information and research. We are committed to supporting both the public and healthcare professionals with educational resources that foster informed decision-making and promote wellness. By bridging modern medical science with everyday life, mediscript inspires people to embrace healthier habits, seek new knowledge, and pursue happiness through holistic well-being. Together, we are building a brighter, more hopeful future—one script at a time.