বিশ্বজুড়ে বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ, চিকিৎসায় বড় চ্যালেঞ্জের সতর্কতা
বিশ্বে বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রতি ছয়টি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের একটিতে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করেনি।
ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যবহার, ভুলভাবে ব্যবহার এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নানা ঘাটতির কারণে এসব ওষুধের বিরুদ্ধে ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে। ফলে এমন কিছু সংক্রমণও ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছে, যেগুলো একসময় তুলনামূলক সহজেই চিকিৎসা করা যেত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, পরিস্থিতি এখন বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া সাধারণ ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রায় প্রতি ছয়টির একটিতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ দেখা গেছে। একই সময়ে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পর্যবেক্ষণ করা প্যাথোজেন-অ্যান্টিবায়োটিক সমন্বয়ের ৪০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে প্রতিরোধ বেড়েছে; এসব ক্ষেত্রে গড় বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৫ থেকে ১৫ শতাংশ।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ কী?
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যখন ব্যাকটেরিয়া কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাবকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। ফলে সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে মানুষের শরীর অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে গেছে; বরং সংক্রমণকারী ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি বা ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের কারণে সংক্রমণ চিকিৎসা করা কঠিন বা কখনো কখনো অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে গুরুতর অসুস্থতা, জটিলতা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কেন বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ?
অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন না থাকলেও ব্যবহার করা, ভুল ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ শুরু করা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক বা অতিরিক্ত ব্যবহার প্রতিরোধ বাড়ার অন্যতম কারণ। WHO বলছে, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অপব্যবহার ও অতিরিক্ত ব্যবহার ড্রাগ-প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে।
এ ছাড়া সংক্রমণ প্রতিরোধে দুর্বলতা, পর্যাপ্ত রোগনির্ণয় সুবিধার অভাব, মানসম্মত ওষুধ ও টিকার সীমিত প্রাপ্যতা এবং নতুন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ তৈরিতে গবেষণার ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
কোন জীবাণু নিয়ে বেশি উদ্বেগ?
WHO-এর ২০২৫ সালের বৈশ্বিক নজরদারি প্রতিবেদনে গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়াকে বিশেষ উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে Escherichia coli বা ই. কোলাই এবং Klebsiella pneumoniae রক্তপ্রবাহের সংক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ড্রাগ-প্রতিরোধী জীবাণু হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের সংক্রমণ গুরুতর হলে সেপসিস, অঙ্গ বিকল হওয়া এবং মৃত্যুর মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে।
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ই. কোলাইয়ের ৪০ শতাংশের বেশি এবং কে. নিউমোনিয়ার ৫৫ শতাংশের বেশি তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী। কিছু অঞ্চলে এই হার আরও বেশি। একই সঙ্গে কার্বাপেনেমের মতো গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ বাড়ছে, ফলে চিকিৎসার বিকল্প সীমিত হয়ে পড়ছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ঝুঁকি বেশি
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের মাত্রা বিশ্বের সব অঞ্চলে সমান নয়। WHO-এর হিসাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, এসব অঞ্চলে রিপোর্ট করা প্রায় প্রতি তিনটি সংক্রমণের একটিতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ পাওয়া গেছে।
তবে এই পরিসংখ্যান ব্যাখ্যা করার সময় নজরদারি ব্যবস্থার পার্থক্যও বিবেচনা করা জরুরি। যেসব দেশে পরীক্ষাগার, রোগনির্ণয় ও নজরদারি ব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল, সেখানে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ভুলভাবে পরিমাপ করা কঠিন হতে পারে।
চিকিৎসাব্যবস্থায় কী প্রভাব পড়তে পারে?
অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা কমে গেলে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাতেও বেশি সময় ও ব্যয় লাগতে পারে। চিকিৎসকদের তুলনামূলক শক্তিশালী বা দ্বিতীয় সারির অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর হাসপাতালে থাকার সময় এবং চিকিৎসার খরচও বেড়ে যেতে পারে।
এর প্রভাব শুধু সংক্রমণের রোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন এবং অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতির নিরাপত্তাও কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভর করে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে গেলে এসব চিকিৎসার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ঠেকাতে কী করা যায়?
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা।
- ভাইরাসজনিত সাধারণ সর্দি-কাশির মতো রোগে নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া।
- চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত ওষুধ সঠিকভাবে ব্যবহার করা।
- প্রয়োজন ছাড়া অন্যের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বা নিজের ওষুধ অন্যকে দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
- নিয়মিত হাত ধোয়া ও সংক্রমণ প্রতিরোধের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।
- প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণের মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো।
- স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষাগারভিত্তিক রোগনির্ণয় জোরদার করা।
শুধু চিকিৎসকের নয়, সবার দায়িত্ব
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ মোকাবিলায় শুধু নতুন ওষুধ আবিষ্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সঠিক রোগনির্ণয়, প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং নিয়মিত নজরদারি—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে কাজ করতে হবে। WHO মানবস্বাস্থ্য, প্রাণিস্বাস্থ্য ও পরিবেশকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে ‘One Health’ পদ্ধতির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে।
২০২৩ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে WHO-এর প্রতিবেদনে বিশ্বের ১০৪টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি ব্যাকটেরিয়াল পরীক্ষায় নিশ্চিত সংক্রমণের তথ্য এতে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে বিশ্বের সব দেশের নজরদারি ব্যবস্থা সমান শক্তিশালী নয়। তাই নিয়মিত ও মানসম্মত তথ্য সংগ্রহ ভবিষ্যতের চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোগীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হলে তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা জরুরি। নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা, পুরোনো প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ খাওয়া বা অন্যের ব্যবহৃত ওষুধ নেওয়া উচিত নয়। কোনো সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন কি না, কোন ওষুধ প্রয়োজন এবং কতদিন ব্যবহার করতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত রোগীর উপসর্গ, পরীক্ষা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের প্রবণতা বাড়তে থাকায় এটি এখন শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকদের সমস্যা নয়; ব্যক্তি, পরিবার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতেও গুরুতর ও সাধারণ ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের চিকিৎসা কার্যকর রাখার সুযোগ বাড়বে।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0