ঠান্ডা পানি পান করলে কি সত্যিই সর্দি-কাশি হয়? জানুন সত্যতা
ঠান্ডা পানি পান করলেই সর্দি-কাশি হয়—এ ধারণার পেছনে কতটা সত্যতা আছে? জানুন সর্দি-কাশির প্রকৃত কারণ ও ঠান্ডা পানির প্রভাব।
ঠান্ডা পানি পান করলেই সর্দি-কাশি হয়—এমন ধারণা আমাদের সমাজে বেশ প্রচলিত। বিশেষ করে শীতকাল বা বৃষ্টির দিনে অনেকেই ঠান্ডা পানি, বরফ বা ঠান্ডা পানীয় এড়িয়ে চলেন সর্দি-কাশির ভয়ে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি আসলে কতটা সত্য? ঠান্ডা পানি পান করা এবং সাধারণ সর্দি-কাশির মধ্যে সরাসরি কারণ-সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক তথ্যের পার্থক্য রয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ সর্দি মূলত একটি ভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ। বিভিন্ন ধরনের শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস এর জন্য দায়ী হতে পারে এবং রাইনোভাইরাস (Rhinovirus) সাধারণ সর্দির অন্যতম প্রধান কারণ। অর্থাৎ শুধু ঠান্ডা পানি পান করার কারণে শরীরে ভাইরাস তৈরি হয়ে যায় না বা সরাসরি সর্দি-কাশি শুরু হয় না। CDC-এর তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের সংক্রমণ থেকেই সাধারণ সর্দি হয়।
ঠান্ডা পানি কি সরাসরি সর্দি-কাশির কারণ?
সংক্ষেপে উত্তর হলো—না, ঠান্ডা পানি নিজে সাধারণ সর্দির ভাইরাস তৈরি করে না। সাধারণ সর্দি একটি সংক্রমণ, যার জন্য ভাইরাস দায়ী। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির ড্রপলেট, ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ অথবা দূষিত কোনো পৃষ্ঠ স্পর্শ করার পর চোখ, নাক বা মুখে হাত দেওয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
তাই কেউ ঠান্ডা পানি পান করার পর সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হলে সেটি সবসময় ঠান্ডা পানির কারণে হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। অনেক সময় ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর কয়েক দিন পর উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে। ফলে ঠান্ডা পানি পান করার সময়টিকে অসুস্থ হওয়ার কারণ মনে হতে পারে, যদিও সংক্রমণটি তার আগেই হয়ে থাকতে পারে।
তাহলে ঠান্ডা পানি পান করার পর কারও কাশি কেন হতে পারে?
যদিও ঠান্ডা পানি সাধারণ সর্দির সরাসরি কারণ নয়, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খুব ঠান্ডা পানি বা ঠান্ডা পানীয় গলা ও শ্বাসনালিতে সাময়িক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। কারও গলা আগে থেকেই সংবেদনশীল থাকলে ঠান্ডা তরল পান করার পর কাশি, গলা খুসখুস বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। তবে এই সাময়িক প্রতিক্রিয়াকে ভাইরাসজনিত সর্দি-কাশির সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
অন্যদিকে, আগে থেকেই সর্দি, গলা ব্যথা বা কাশি থাকলে অনেকের কাছে উষ্ণ তরল বেশি আরামদায়ক মনে হতে পারে। Mayo Clinic-এর তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত তরল পান করা গুরুত্বপূর্ণ এবং উষ্ণ তরল গলা আরাম দিতে ও নাক বন্ধভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সর্দি-কাশির প্রকৃত কারণ কী?
সাধারণ সর্দি মূলত ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে হয়। CDC বলছে, ২০০টিরও বেশি শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস সাধারণ সর্দির মতো উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে রাইনোভাইরাস অন্যতম সাধারণ কারণ। সাধারণ সর্দির উপসর্গের মধ্যে নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, হাঁচি, কাশি, গলা ব্যথা, মাথাব্যথা এবং হালকা শরীর ব্যথা থাকতে পারে।
শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসগুলো সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচি থেকে বের হওয়া ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ বা ভাইরাসযুক্ত কোনো পৃষ্ঠ স্পর্শ করে পরে নাক, চোখ বা মুখ স্পর্শ করলেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। CDC-এর তথ্য অনুযায়ী, বছরের যেকোনো সময় সাধারণ সর্দিতে আক্রান্ত হওয়া সম্ভব।
ঠান্ডা আবহাওয়া আর ঠান্ডা পানি—দুটো কি একই বিষয়?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ঠান্ডা আবহাওয়ার সময় কিছু শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস বেশি ছড়াতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ঠান্ডা পানি পান করলেই সেই ভাইরাস শরীরে ঢুকে যাবে। ঠান্ডা আবহাওয়া, মানুষের বেশি সময় ঘরের ভেতরে থাকা এবং ভাইরাসের মৌসুমি বিস্তারের মতো বিভিন্ন কারণ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থাৎ “ঠান্ডা পানি = সর্দি” এমন সরল সমীকরণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। বরং সংক্রমণ প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা, আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং অসুস্থ অবস্থায় অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে না দেওয়ার মতো বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সর্দি-কাশি হলে ঠান্ডা পানি কি একেবারে নিষেধ?
সাধারণভাবে সর্দি-কাশি হলে পর্যাপ্ত তরল পান করা গুরুত্বপূর্ণ। পানি শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। কারও কাছে ঠান্ডা পানি আরামদায়ক হলে এবং পান করার পর কোনো অস্বস্তি না হলে শুধু ঠান্ডা হওয়ার কারণে সেটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার বৈজ্ঞানিক কারণ নেই।
তবে কারও গলা ব্যথা বা কাশি থাকলে উষ্ণ পানি, চা বা অন্যান্য উষ্ণ তরল তুলনামূলকভাবে বেশি স্বস্তি দিতে পারে। তাই পানির তাপমাত্রার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আরামও বিবেচনা করা যেতে পারে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন?
সাধারণ সর্দির বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিশেষ চিকিৎসা ছাড়াই ধীরে ধীরে উপসর্গ ভালো হয়ে যায়। তবে শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতার লক্ষণ, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, ১০ দিনের বেশি সময়েও উপসর্গের উন্নতি না হওয়া অথবা ভালো হওয়ার পর আবার কাশি বা জ্বর বেড়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, ছোট শিশু, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। COVID-19 বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো কিছু সংক্রমণও সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ সৃষ্টি করতে পারে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
শেষ কথা
ঠান্ডা পানি পান করলেই সর্দি-কাশি হয়—এটি মূলত একটি প্রচলিত ধারণা। সাধারণ সর্দি মূলত ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে হয়; ঠান্ডা পানি নিজে সেই সংক্রমণের সরাসরি কারণ নয়। তবে খুব ঠান্ডা পানীয় কিছু মানুষের গলা বা শ্বাসনালিতে সাময়িক অস্বস্তি বা কাশি বাড়াতে পারে। তাই শরীরের প্রতিক্রিয়া ও ব্যক্তিগত আরাম অনুযায়ী পানি পান করাই ভালো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত পানি পান করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া, হাত পরিষ্কার রাখা এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে চলা।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0