অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারে বাড়ছে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি

অপ্রয়োজনে ও ভুলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে বাড়ছে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি। ফলে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও ভবিষ্যতে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সেপ্টে 23, 2026 - 15:31
 0  1
অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারে বাড়ছে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি
অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারে বাড়ছে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি

অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারে বাড়ছে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর ঝুঁকি

ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ, রক্তের সংক্রমণসহ বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক জীবন রক্ষা করতে পারে। তবে প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ, ভুল ওষুধ ব্যবহার কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বারবার সেবনের কারণে তৈরি হচ্ছে নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি—অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে সাধারণ সংক্রমণের জন্য পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া প্রতি ছয়টির মধ্যে প্রায় একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ছিল। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পর্যবেক্ষণ করা জীবাণু-অ্যান্টিবায়োটিক সমন্বয়ের ৪০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে প্রতিরোধ বেড়েছে।

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ কী?

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যখন কোনো ব্যাকটেরিয়া নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাবকে প্রতিহত করার ক্ষমতা অর্জন করে। তখন যে ওষুধ আগে ওই জীবাণুকে ধ্বংস বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, সেটি আর কার্যকর নাও হতে পারে। ফলে সংক্রমণ সারাতে অন্য ওষুধ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

এটি মানুষের শরীর অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে যাওয়ার বিষয় নয়; বরং ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি ও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়। অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ও ভুল ব্যবহার এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক কেন ঝুঁকিপূর্ণ?

প্রয়োজন না থাকলেও অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে শরীরে থাকা সংবেদনশীল ব্যাকটেরিয়া কমে যেতে পারে, কিন্তু প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া টিকে থাকার সুযোগ পায়। পরে এসব জীবাণু ছড়িয়ে পড়লে একই অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সংক্রমণের চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

WHO বলছে, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও অতিরিক্ত ব্যবহার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। ২০২২ সালের বৈশ্বিক ব্যবহারের তথ্যেও দেখা গেছে, প্রতিরোধ তৈরির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি এমন ‘Watch’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার অনেক দেশে উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে উদ্বেগ

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। WHO-এর ২০২৪ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের মোট ব্যবহার ২০১৮ সালের ১৯.৮ ডিডিডি (প্রতি ১,০০০ জনে প্রতিদিন নির্ধারিত দৈনিক ডোজ) থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ৫৫.৫ ডিডিডি এবং ২০২২ সালে ৪৮.৯ ডিডিডিতে পৌঁছেছিল। একই বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২ সালে ‘Access’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক মোট ব্যবহারের মাত্র ২৯ শতাংশ ছিল।

WHO আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রেসক্রিপশন-নির্ভর ওষুধ হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক কেনা ও নিজে থেকে সেবনের প্রবণতাও রয়েছে।

সর্দি-কাশি হলেই অ্যান্টিবায়োটিক নয়

অ্যান্টিবায়োটিক মূলত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করে। তাই সব ধরনের জ্বর, সর্দি, কাশি বা গলা ব্যথায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। বিশেষ করে অনেক সাধারণ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ভাইরাসের কারণে হয়, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়।

তাই শুধু উপসর্গ দেখে নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়। রোগের কারণ, শারীরিক অবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন অ্যান্টিবায়োটিক দরকার কি না এবং কোন ওষুধ উপযুক্ত।

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন

  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা
  • অন্য কারও প্রেসক্রিপশন দেখে একই ওষুধ ব্যবহার করা
  • আগের অসুস্থতার বেঁচে থাকা অ্যান্টিবায়োটিক নিজে থেকে খাওয়া
  • ভাইরাল সংক্রমণে অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া
  • চিকিৎসকের দেওয়া ডোজ ও সময়সূচি নিজের মতো পরিবর্তন করা
  • উপসর্গ কমে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চিকিৎসা বন্ধ করা

তবে চিকিৎসকের দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পর্কে কোনো সমস্যা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে নিজের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বাড়লে কী হতে পারে?

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বাড়তে থাকলে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসা আরও জটিল হতে পারে। কার্যকর ওষুধের সংখ্যা কমে গেলে চিকিৎসার সময় ও খরচ বাড়তে পারে এবং গুরুতর সংক্রমণে জটিলতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

এর প্রভাব শুধু সংক্রামক রোগের চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ নয়। অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের কিছু চিকিৎসা এবং অন্যান্য আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির নিরাপত্তাও কার্যকর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের ওপর নির্ভর করে। WHO অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।

ঝুঁকি কমাতে কী করা প্রয়োজন?

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ মোকাবিলায় রোগী, চিকিৎসক, ফার্মেসি, হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান—সবার দায়িত্ব রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, সঠিক রোগ নির্ণয়ের সুযোগ বাড়ানো, সংক্রমণ প্রতিরোধ, টিকাদান এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কমানো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

WHO-এর মতে, অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানসম্মত রোগ নির্ণয়ের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। ২০২৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সমাবেশ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় ২০২৬–২০৩৬ মেয়াদের হালনাগাদ বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনাও গ্রহণ করেছে।

সচেতন ব্যবহারেই অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা রক্ষা সম্ভব

অ্যান্টিবায়োটিক একটি মূল্যবান চিকিৎসা সম্পদ। প্রয়োজনের সময় সঠিক ওষুধ ব্যবহার যেমন রোগীকে সুস্থ করতে সাহায্য করে, তেমনি অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার ভবিষ্যতে চিকিৎসার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। তাই জ্বর, সর্দি-কাশি বা অন্য কোনো সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার শুধু একজন রোগীর জন্য নয়—সমাজে ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ। এখনই সচেতন ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

পছন্দ পছন্দ 0
অপছন্দ অপছন্দ 0
ভালোবাসা ভালোবাসা 0
মজার মজার 0
রাগান্বিত রাগান্বিত 0
দুঃখিত দুঃখিত 0
ওয়াউ ওয়াউ 0
admin mediscript (Medi+Script) is dedicated to advancing health awareness, medical education, and community well-being. Our organization serves as a vibrant platform where healthcare knowledge meets daily living, aiming to inspire hope, happiness, and a healthier future for all. Our mission is to empower individuals, families, and communities with reliable, up-to-date medical information and research. We are committed to supporting both the public and healthcare professionals with educational resources that foster informed decision-making and promote wellness. By bridging modern medical science with everyday life, mediscript inspires people to embrace healthier habits, seek new knowledge, and pursue happiness through holistic well-being. Together, we are building a brighter, more hopeful future—one script at a time.