অল্প বয়সেই হাড় দুর্বল হওয়ার কারণ কী? প্রতিরোধে কোন অভ্যাসগুলো জরুরি?
কম ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা অল্প বয়সে হাড় দুর্বল করতে পারে। হাড়ের শক্তি ধরে রাখতে কোন অভ্যাসগুলো জরুরি, জানুন।
অল্প বয়সে হাড় দুর্বল হওয়া কি সম্ভব?
হাড় দুর্বল হওয়া মানেই যে শুধু বয়স্কদের সমস্যা, এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। অল্প বয়সে গুরুতর হাড়ের দুর্বলতা তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেলেও খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, দীর্ঘদিনের কিছু রোগ, নির্দিষ্ট ওষুধ এবং কিছু হরমোনজনিত সমস্যার কারণে তরুণ বয়সেও হাড়ের ঘনত্ব কমে যেতে পারে। বিশেষ করে শৈশব, কৈশোর ও তরুণ বয়স হাড়ের শক্তি তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে পর্যাপ্ত হাড়ের ভর তৈরি না হলে পরবর্তী জীবনে হাড় ভঙ্গুর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অস্টিওপোরোসিস এমন একটি রোগ, যেখানে হাড়ের ঘনত্ব ও গঠন কমে গিয়ে হাড় সহজে ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। সাধারণত এটি নীরব রোগ—হাড় ভাঙার আগে অনেকের কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। তাই অল্প বয়স থেকেই হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখার অভ্যাস তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
কেন অল্প বয়সেই হাড় দুর্বল হতে পারে?
১. খাবারে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি
হাড়ের গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাবারে দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম না থাকলে শরীর প্রয়োজন মেটাতে হাড় থেকে ক্যালসিয়াম ব্যবহার করতে পারে, যা সময়ের সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, কিছু শাকসবজি, মাছ এবং ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।
জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের প্রতিদিন প্রায় ১,৩০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম প্রয়োজন হতে পারে। ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত প্রায় ১,০০০ মিলিগ্রাম প্রয়োজন হয়। ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে, তাই বিশেষ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।
২. ভিটামিন ডির ঘাটতি
শুধু ক্যালসিয়াম খেলেই হাড় সুস্থ থাকে না। শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণের জন্য ভিটামিন ডি গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি না থাকলে খাবার থেকে পাওয়া ক্যালসিয়াম শরীর যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারে না। সূর্যালোক, কিছু মাছ, ডিমের কুসুম এবং ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার এর উৎস হতে পারে।
৩. দীর্ঘসময় বসে থাকা ও ব্যায়ামের অভাব
সারাদিন বসে থাকা, নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা না করা হাড়ের জন্য ভালো নয়। দীর্ঘদিন শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হাড়ের ক্ষয় বাড়াতে পারে। অন্যদিকে হাঁটা, সিঁড়ি ওঠা এবং শক্তিবর্ধক ব্যায়ামের মতো শরীরের ওজন বহনকারী ও প্রতিরোধমূলক ব্যায়াম হাড়ের শক্তি বজায় রাখতে সহায়ক।
৪. অতিরিক্ত ওজন কমানোর চেষ্টা ও অপুষ্টি
শরীরের ওজন খুব কম থাকা এবং দীর্ঘদিন অপর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ হাড়ের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত ডায়েটিং বা পর্যাপ্ত প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি না পাওয়া হাড়ের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৫. ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল
ধূমপান হাড় দুর্বল হওয়ার একটি পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি। একইভাবে অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণও হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং ভাঙার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং অ্যালকোহল গ্রহণ সীমিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
৬. কিছু রোগ ও দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ
অল্প বয়সে হাড় দুর্বল হওয়ার পেছনে শুধু জীবনযাপন দায়ী নয়। কিছু হরমোনজনিত, পরিপাকতন্ত্রের ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ হাড়ের ঘনত্ব কমাতে পারে। তরুণদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের কিছু রোগ বা খাদ্য শোষণে সমস্যা থাকলেও ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন কিছু ওষুধ—বিশেষ করে কর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ—ব্যবহার করলেও হাড়ের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ ব্যবহারকারীদের চিকিৎসকের সঙ্গে হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়েও আলোচনা করা উচিত।
অল্প বয়সে হাড় শক্ত রাখতে কোন অভ্যাসগুলো জরুরি?
১. ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ সুষম খাবার খান
খাদ্যতালিকায় দুধ, দই, পনিরসহ দুগ্ধজাত খাবার, গাঢ় সবুজ পাতাযুক্ত কিছু সবজি, মাছ এবং ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ অন্যান্য খাবার রাখা যেতে পারে। শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা ভালো।
২. ভিটামিন ডির পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করুন
ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে। খাদ্য ও নিরাপদ সূর্যালোকের সংস্পর্শের মাধ্যমে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। তবে কারও ভিটামিন ডির ঘাটতি থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা ও সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দিতে পারেন। নিজের ইচ্ছায় উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি গ্রহণ করা উচিত নয়।
৩. নিয়মিত ওজন বহনকারী ও শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করুন
হাঁটা, সিঁড়ি ওঠা, দৌড়ানো, নাচ বা খেলাধুলার মতো ওজন বহনকারী শারীরিক কর্মকাণ্ড হাড়ের ওপর উপযুক্ত চাপ তৈরি করে। পাশাপাশি শক্তিবর্ধক বা রেজিস্ট্যান্স ব্যায়ামও হাড় ও পেশির শক্তি বজায় রাখতে সহায়ক। WHO প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০–৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশিশক্তিবর্ধক ব্যায়াম করার পরামর্শ দেয়।
৪. ধূমপান থেকে দূরে থাকুন
ধূমপানের অভ্যাস থাকলে তা ত্যাগ করা হাড়ের পাশাপাশি সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শও যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত।
৫. অতিরিক্ত ডায়েটিং এড়িয়ে চলুন
ওজন কমানোর জন্য দীর্ঘদিন খুব কম খাবার খাওয়া বা প্রয়োজনীয় পুষ্টি বাদ দেওয়া হাড়ের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি ও অন্যান্য পুষ্টি গ্রহণ করা জরুরি।
কোন লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
অস্টিওপোরোসিসকে অনেক সময় ‘নীরব রোগ’ বলা হয়, কারণ হাড়ের ঘনত্ব কমে গেলেও শুরুতে কোনো ব্যথা বা স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তবে অল্প বয়সে সামান্য আঘাতেই বারবার হাড় ভেঙে যাওয়া, অস্বাভাবিক পিঠব্যথা, উচ্চতা কমে আসা বা মেরুদণ্ডের গঠনে পরিবর্তনের মতো বিষয় দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন কর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ গ্রহণ, মাসিক অনিয়ম বা দীর্ঘদিন মাসিক বন্ধ থাকা, খুব কম ওজন, খাদ্য শোষণের সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী রোগ অথবা পরিবারের সদস্যদের অল্প বয়সে হাড় ভাঙার ইতিহাস থাকলেও চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তির ঝুঁকি অনুযায়ী হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
অল্প বয়সের হাড়ের যত্ন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
মানুষের হাড়ের ভর ও শক্তি শৈশব থেকে তরুণ বয়সে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। সাধারণভাবে ২০-এর দশক পর্যন্ত হাড়ের ভর তৈরি হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময় থাকে। এই সময়ে যত ভালোভাবে সর্বোচ্চ হাড়ের ভর তৈরি করা যায়, পরবর্তী জীবনে হাড়ের ক্ষয়ের বিরুদ্ধে তত বেশি সুরক্ষা তৈরি হতে পারে।
তাই হাড়ের যত্ন শুধু বয়স্ক হওয়ার পর শুরু করার বিষয় নয়। ছোটবেলা থেকেই পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদি হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
অল্প বয়সে হাড় দুর্বল হওয়ার পেছনে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডির ঘাটতি, অপর্যাপ্ত পুষ্টি, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত ডায়েটিং, ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল, কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং নির্দিষ্ট ওষুধের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে প্রতিটি মানুষের ঝুঁকি এক নয়।
হাড় শক্ত রাখতে তাই নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম ও পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি, স্বাস্থ্যকর ওজন এবং ধূমপানমুক্ত জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। অস্বাভাবিকভাবে সহজে হাড় ভেঙে গেলে বা ঝুঁকির কোনো কারণ থাকলে নিজে থেকে সাপ্লিমেন্ট না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
অল্প বয়সের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই ভবিষ্যতের শক্ত হাড়ের অন্যতম ভিত্তি।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0