৫৯% হামের সংক্রমণ হাসপাতাল-স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই: নতুন গবেষণায় তথ্য
দক্ষিণাঞ্চলের ১৭০–২০০ শিশুর ওপর গবেষণায় ৫৯.৪% হামের রোগীর হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। গবেষকেরা জোর দিয়েছেন আইসোলেশন ও টিকাদানে।
৫৯% হামের সংক্রমণ হাসপাতাল-স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই: নতুন গবেষণায় তথ্য
বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় বাংলাদেশের হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে করা একটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শিশুদের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশের হামের সংক্রমণের সঙ্গে কোনো না কোনো হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে থাকার সম্পর্ক ছিল। গবেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত ভিড়, পর্যাপ্ত আইসোলেশন সুবিধার অভাব এবং আক্রান্ত রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করতে না পারা এ ধরনের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কী পাওয়া গেছে নতুন গবেষণায়?
‘Measles Outbreak 2026 in Southern Bangladesh: Epidemiological Profile, Clinical Characteristics, Genetic Analysis with Maternal & Child Antibody Status’ শীর্ষক গবেষণাটি আসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশু গবেষণা দলের সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। গবেষণায় দক্ষিণাঞ্চলের হামে আক্রান্ত শিশুদের রোগের বিস্তার, উপসর্গ, জটিলতা, টিকাদানের অবস্থা এবং ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে গবেষণার নমুনা আকার ১৭০ শিশুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে; অন্য একটি উপস্থাপনা-ভিত্তিক প্রতিবেদনে ২০০ শিশু ও ১০০ মায়ের তথ্যের কথা বলা হয়েছে।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শিশুদের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশের হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সংস্পর্শের ইতিহাস পাওয়া যায়। গবেষকেরা এটিকে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন। তবে গবেষণাটি হাসপাতালভিত্তিক হওয়ায় এই হার বাংলাদেশের সব হামের রোগীর ক্ষেত্রে একই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
হাসপাতালেই কেন হাম ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে?
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ড, অপেক্ষাকক্ষ বা চিকিৎসা নেওয়ার জায়গায় অন্য রোগী ও স্বজনদের কাছাকাছি থাকলে সংক্রমণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যখন কোনো শিশুর হাম শুরু হলেও প্রথম দিকে রোগটি শনাক্ত না হয়, তখন তাকে অন্যান্য রোগীর সঙ্গে একই জায়গায় রাখা হলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
নতুন গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা জানিয়েছেন, হাসপাতালের শয্যা সংকটের কারণে কোথাও কোথাও একাধিক শিশুকে একই শয্যায় রাখতে হচ্ছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে হাম আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন শিশু রোগ নির্ণয়ের আগে সাধারণ ওয়ার্ডেই অবস্থান করছে। এসব পরিস্থিতি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে।
এর আগে বিভিন্ন দেশের গবেষণাতেও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামের সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে অপেক্ষাকক্ষ ও অন্যান্য জনসমাগমপূর্ণ জায়গায় সংক্রমণ ঘটতে পারে—বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত ও আলাদা করা না গেলে।
শিশুদের একটি বড় অংশ টিকার বয়সের আগেই আক্রান্ত
নতুন গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ খুব অল্প বয়সী। গবেষণায় প্রায় ৪৬ শতাংশ শিশু নয় মাসের কম বয়সী ছিল। বাংলাদেশে নিয়মিত সূচিতে প্রথম হাম-রুবেলা টিকা সাধারণত নয় মাস বয়সে দেওয়া হয়। ফলে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা টিকা নেওয়ার আগেই হামের সংস্পর্শে এলে তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১৭০ শিশুর মধ্যে ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত এলাকার এবং ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশ নিম্নআয়ের পরিবারের ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, অপুষ্টি, দারিদ্র্য, অতিরিক্ত ভিড় এবং ভিটামিন এ-এর ঘাটতির মতো বিষয়গুলো গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
অপুষ্টিতে বাড়তে পারে জটিলতার ঝুঁকি
গবেষণায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে গুরুতর অপুষ্টির হারও উল্লেখযোগ্য ছিল। প্রায় ৩১ শতাংশ শিশু গুরুতর অপুষ্টিতে ভুগছিল বলে গবেষণার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। গবেষকেরা আরও জানিয়েছেন, নিউমোনিয়া ছিল সবচেয়ে বেশি দেখা জটিলতাগুলোর একটি এবং একাধিক শিশুর অন্যান্য জটিলতাও দেখা যায়।
গবেষণায় ভিটামিন এ গ্রহণের বিষয়টিও দেখা হয়েছে। আগের ছয় মাসে মাত্র ৩২ শতাংশ শিশু ভিটামিন এ ক্যাপসুল পেয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যেসব শিশু ভিটামিন এ পায়নি, তাদের মধ্যে গুরুতর জটিলতার হার বেশি ছিল। তবে গবেষণাটি পর্যবেক্ষণমূলক হওয়ায় শুধু ভিটামিন এ না পাওয়াই গুরুতর জটিলতার সরাসরি কারণ—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
গবেষণায় নতুন কোনো হাম ভাইরাসের ধরন পাওয়া যায়নি
গবেষণার অংশ হিসেবে ১৭টি নমুনার জিনগত বিশ্লেষণ করা হয়। সব নমুনাতেই বি৩ (B3) জিনোটাইপ শনাক্ত হয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, এটি নতুন বা অজানা কোনো হাম ভাইরাসের ধরন নয় এবং বাংলাদেশসহ বিভিন্ন স্থানে আগে এই জিনোটাইপ শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় নতুন বা টিকা-প্রতিরোধী কোনো ধরন শনাক্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, বর্তমান পরিস্থিতিকে নতুন কোনো ভাইরাসের উদ্ভব হিসেবে দেখার চেয়ে টিকাদানে ঘাটতি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্ত ও আলাদা করার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—এমনটাই গবেষণার ফলাফল থেকে উঠে আসে।
বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৬ সালে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে দেশে ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী এবং প্রায় ২ হাজার ৯০০ পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছিল। তখন ৫৮টি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল এবং আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশ ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ টিকাদান, রোগ নজরদারি, পরীক্ষাগার সক্ষমতা এবং হাসপাতালের প্রস্তুতি জোরদারের উদ্যোগ নেয়। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিও চালানো হয়।
হাসপাতালে সংক্রমণ কমাতে কী করা জরুরি?
গবেষকেরা হামে আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে আলাদা রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মেনে চলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক চিকিৎসা সুবিধা তৈরি করার সুপারিশ করা হয়েছে।
- হাম সন্দেহ হলে শিশুকে দ্রুত শনাক্ত ও পৃথক রাখা
- সন্দেহভাজন রোগীকে সাধারণ ওয়ার্ডে দীর্ঘসময় না রাখা
- হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইসোলেশন সুবিধা নিশ্চিত করা
- অতিরিক্ত ভিড় কমানো এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা
- স্বাস্থ্যকর্মীদের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক প্রশিক্ষণ জোরদার করা
- টিকাদান কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনা
বিশেষ করে হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় রোগী হাসপাতালে আসার পর দ্রুত ঝুঁকি শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। অপেক্ষাকক্ষ বা সাধারণ ওয়ার্ডে দীর্ঘসময় অন্য রোগীদের সঙ্গে থাকলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাতেও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামের সংক্রমণ ঠেকাতে দ্রুত শনাক্তকরণ ও আইসোলেশনের গুরুত্ব দেখা গেছে।
অভিভাবকদের কী জানা জরুরি?
শিশুর জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে হাম হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শিশুকে নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন এবং হাসপাতালে যাওয়ার আগে সম্ভব হলে হাম বা সংক্রামক রোগের সন্দেহের বিষয়টি জানানো ভালো। এতে স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রয়োজনীয় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিতে পারেন।
একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদানের সময়সূচি অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিকার কোনো ডোজ বাদ পড়ে গেলে স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের কাছ থেকে পরবর্তী করণীয় জেনে নেওয়া উচিত। যেসব শিশু নিয়মিত টিকার বয়সে পৌঁছায়নি, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
হাসপাতাল যেন চিকিৎসার পাশাপাশি সংক্রমণের উৎস না হয়
নতুন গবেষণার ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশের তথ্যটি পুরো দেশের পরিস্থিতির পরিমাপ নয়, কিন্তু এটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। চলমান হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে হাসপাতালে আক্রান্ত ও অনাক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং পর্যাপ্ত আইসোলেশন সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য টিকাদানের ঘাটতি পূরণ, বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা, অপুষ্টি মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। টিকা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ—দুই দিকেই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে শিশুদের মধ্যে হামের বিস্তার ও গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0