হঠাৎ বুকব্যথা হলে কী করবেন? হাসপাতালে যাওয়ার আগে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
হঠাৎ বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা ঠান্ডা ঘাম হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। জরুরি সাহায্য নিন, নিজে গাড়ি চালাবেন না এবং বিপজ্জনক ভুলগুলো এড়িয়ে চলুন।
হঠাৎ বুকব্যথা হলে কী করবেন?
হঠাৎ বুকব্যথা শুরু হলে অনেকেই প্রথমে গ্যাস, অ্যাসিডিটি বা বদহজমের কথা ভাবেন। কেউ বিশ্রাম নেন, কেউ পানি পান করেন, আবার কেউ ব্যথা কমানোর জন্য নিজের মতো করে ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা করেন। কিন্তু বুকব্যথার কারণ সবসময় সাধারণ নয়। কখনো এটি হার্ট অ্যাটাক বা হৃদ্যন্ত্রে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার মতো প্রাণঘাতী সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। তাই নতুন, তীব্র বা অস্বাভাবিক বুকব্যথাকে অবহেলা না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) জানায়, হার্ট অ্যাটাকের সময় বুকের মাঝখানে চাপ, চেপে ধরা, ভারী লাগা বা ব্যথা হতে পারে। অস্বস্তি কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হতে পারে, আবার কমে গিয়ে ফিরে আসতে পারে। ব্যথা হাত, পিঠ, ঘাড়, চোয়াল বা পেটের ওপরের অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তিও দেখা দিতে পারে।
বুকব্যথার সঙ্গে যে লক্ষণগুলো থাকলে জরুরি সাহায্য নেবেন
- বুকের মাঝখানে চাপ, চেপে ধরা বা ভারী অনুভূতি
- ব্যথা এক বা দুই হাত, পিঠ, ঘাড় কিংবা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া
- শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
- ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
- হঠাৎ মাথা ঘোরা, দুর্বল হয়ে পড়া বা অজ্ঞান হওয়ার অনুভূতি
- হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত বা অনিয়মিত হওয়া
নারীদের ক্ষেত্রে বুকের অস্বস্তির পাশাপাশি অস্বাভাবিক ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব বা পিঠ ও কাঁধে ব্যথাও থাকতে পারে। বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কারও ক্ষেত্রে লক্ষণ তুলনামূলকভাবে অস্পষ্টও হতে পারে। লক্ষণগুলো সবসময় একসঙ্গে দেখা যায় না।
হঠাৎ বুকব্যথা হলে প্রথমে কী করবেন?
১. জরুরি সেবায় ফোন করুন
হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা হলে ব্যথা নিজে থেকে কমে কি না, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করবেন না। বাংলাদেশে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে জরুরি সহায়তা ও অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে জানান। সম্ভব হলে কাছের কাউকে সঙ্গে রাখুন এবং ফোনে জরুরি সেবার কর্মীদের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
২. কাজ বন্ধ করে আরামদায়ক অবস্থায় বসুন
হাঁটাহাঁটি, সিঁড়ি ওঠা বা শারীরিক পরিশ্রম বন্ধ করুন। পিঠে সমর্থন দিয়ে আরামদায়ক অবস্থায় বসুন এবং যতটা সম্ভব শান্ত থাকার চেষ্টা করুন। নিজেকে জোর করে হাঁটিয়ে বা কাজ করিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। সাহায্য আসা পর্যন্ত পাশে কেউ থাকলে তিনি রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
৩. আগে থেকে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ থাকলে নির্দেশনা মেনে চলুন
যাঁদের এনজাইনা বা হৃদ্রোগের জন্য চিকিৎসক নির্দিষ্ট ওষুধ বা নাইট্রোগ্লিসারিন স্প্রে দিয়েছেন, তাঁরা চিকিৎসকের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে পারেন। তবে অন্য কারও ওষুধ ব্যবহার করা বা নিজের সিদ্ধান্তে নতুন ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়।
৪. রোগীর অবস্থা খেয়াল রাখুন
রোগী সচেতন আছেন কি না এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন কি না, তা খেয়াল করুন। তিনি অচেতন হয়ে গেলে এবং স্বাভাবিক শ্বাস না নিলে জরুরি সেবার কর্মীদের তাৎক্ষণিকভাবে জানান। ফোনে নির্দেশনা নিয়ে সিপিআর (CPR) শুরু করতে হতে পারে। প্রশিক্ষণ থাকলে নির্দেশনা অনুযায়ী বুকের মাঝখানে দ্রুত ও নিয়মিত চাপ দিন।
হাসপাতালে যাওয়ার আগে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
ভুল ১: ব্যথাকে শুধু গ্যাস বা অ্যাসিডিটি মনে করা
হার্ট অ্যাটাকের অস্বস্তি কখনো বদহজম, বুকজ্বালা বা পেটের অস্বস্তির মতো মনে হতে পারে। তাই বুকব্যথাকে নিশ্চিতভাবে গ্যাসের সমস্যা ধরে নিয়ে চিকিৎসা নিতে দেরি করবেন না। কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
ভুল ২: ব্যথা কমে যাওয়ার অপেক্ষা করা
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কখনো কমে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারে। ব্যথা সাময়িকভাবে কমেছে বলেই বিপদ কেটে গেছে—এমন ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। নতুন বা সন্দেহজনক বুকব্যথা হলে দ্রুত জরুরি সহায়তা নিন।
ভুল ৩: নিজে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়া
বুকব্যথার সঙ্গে হঠাৎ মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা হৃদ্স্পন্দনের বিপজ্জনক পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাই নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। জরুরি সেবা ডাকুন; অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া না গেলে জরুরি সেবার পরামর্শ অনুযায়ী অন্য কাউকে দিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন।
ভুল ৪: নিজের ইচ্ছায় একের পর এক ওষুধ খাওয়া
ব্যথানাশক, অ্যাসিডিটির ওষুধ কিংবা অন্য কোনো ওষুধ খেয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। এতে জরুরি চিকিৎসা নিতে দেরি হতে পারে এবং কিছু ওষুধ ব্যক্তির অন্য রোগ বা চলমান চিকিৎসার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া নতুন ওষুধ শুরু করবেন না।
ভুল ৫: অ্যাসপিরিন সবার জন্য নিরাপদ ধরে নেওয়া
কিছু ক্ষেত্রে সন্দেহজনক হার্ট অ্যাটাকের সময় অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। তবে এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি থাকলে বা চিকিৎসক আগে থেকে এটি এড়িয়ে চলতে বললে খাওয়া উচিত নয়। রক্তপাতের ঝুঁকি বা অন্য চিকিৎসাগত সমস্যা থাকলেও সতর্কতা প্রয়োজন। প্রথমে জরুরি সেবায় ফোন করুন এবং অ্যাসপিরিন নেওয়ার বিষয়ে তাদের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
ভুল ৬: রোগীকে একা রেখে দেওয়া
হঠাৎ বুকব্যথা হলে রোগীকে একা ফেলে রাখা উচিত নয়। তাঁর সঙ্গে থাকুন, জরুরি সেবাকে অবস্থার পরিবর্তন জানান এবং রোগী অচেতন হয়ে গেলে বা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে দ্রুত নির্দেশনা নিন। সম্ভব হলে তাঁর নিয়মিত ওষুধের তালিকা, পরিচিত রোগ এবং অ্যালার্জির তথ্য প্রস্তুত রাখুন—তবে এসব জোগাড় করতে গিয়ে জরুরি ফোন করতে দেরি করবেন না।
বুকব্যথা মানেই কি হার্ট অ্যাটাক?
না। বুকব্যথার পেছনে পেশি বা বুকের দেয়ালের সমস্যা, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, ফুসফুসের রোগ, উদ্বেগসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তবে শুধু ব্যথার ধরন দেখে বাড়িতে বসে নিশ্চিতভাবে কারণ আলাদা করা কঠিন। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা সন্দেহ হলে চিকিৎসকেরা সাধারণত রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি ইসিজি (ECG) এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ট্রোপোনিনের মতো রক্ত পরীক্ষা করেন।
বিশেষ করে নতুন, তীব্র, বারবার ফিরে আসা বা অস্বাভাবিক বুকব্যথা হলে নিজে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।
শেষ কথা
হঠাৎ বুকব্যথা কখনো প্রাণঘাতী হৃদ্রোগের সতর্কসংকেত হতে পারে। তাই ব্যথাকে গ্যাস ভেবে অবহেলা করা, নিজে গাড়ি চালানো, ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা করা কিংবা রোগীকে একা রেখে দেওয়া—এসব ভুল এড়িয়ে চলুন। বাংলাদেশে জরুরি সহায়তার জন্য ৯৯৯-এ ফোন করুন, পরিশ্রম বন্ধ করে আরামদায়ক অবস্থায় থাকুন এবং জরুরি সেবার নির্দেশনা অনুসরণ করুন। দ্রুত চিকিৎসা শুরু হলে জীবন বাঁচানোর এবং হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি কমানোর সম্ভাবনা বাড়তে পারে। <
সতর্কতা: এই প্রতিবেদন সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্যের জন্য। কারও বর্তমানে হঠাৎ বুকব্যথা বা হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহজনক লক্ষণ থাকলে নিবন্ধ পড়া বা অনলাইনে পরামর্শ খোঁজার পরিবর্তে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0