বাংলাদেশে এনসিডি ব্যবস্থাপনায় রোগীর নিরাপত্তায় নতুন গুরুত্ব
বাংলাদেশে হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিসসহ অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় রোগীর নিরাপত্তাকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশে এনসিডি ব্যবস্থাপনায় রোগীর নিরাপত্তায় নতুন গুরুত্ব
হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ অসংক্রামক রোগ বা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস (এনসিডি) এখন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এসব রোগে অনেক রোগীকে বছরের পর বছর, কখনো আজীবন চিকিৎসা, নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। ফলে শুধু রোগ শনাক্ত করা বা চিকিৎসা দেওয়া নয়, পুরো চিকিৎসাপ্রক্রিয়ায় রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০২৬ সালের বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবসে অসংক্রামক রোগের নিরাপদ চিকিৎসাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য “Safe care for life!” বা ‘জীবনভর নিরাপদ চিকিৎসা’—যার মূল লক্ষ্য হলো এনসিডি রোগীদের চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে এড়ানো সম্ভব এমন ক্ষতি কমানো এবং রোগীকে নিরাপদ ও মানসম্মত সেবার অংশীদার করা।
এনসিডি রোগীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঝুঁকি কেন বেশি?
এনসিডি রোগীদের চিকিৎসা সাধারণত একবারের চিকিৎসায় শেষ হয় না। একজন ডায়াবেটিস রোগীকে নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা, ওষুধ গ্রহণ, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হতে পারে। হৃদরোগের রোগীর ক্ষেত্রে নিয়মিত ওষুধ, রক্তচাপ ও অন্যান্য ঝুঁকি-কারক পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি বা অন্যান্য চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপের প্রয়োজন হতে পারে।
এই দীর্ঘ চিকিৎসাপথে রোগীকে একাধিক চিকিৎসক, হাসপাতাল, ক্লিনিক, পরীক্ষাগার ও ওষুধের দোকানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। ফলে তথ্যের ঘাটতি, চিকিৎসার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, ভুল ওষুধ বা মাত্রা, রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব কিংবা প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ না হওয়ার মতো সমস্যার সুযোগ তৈরি হতে পারে। WHO বলছে, দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল চিকিৎসার কারণে এনসিডি রোগীরা স্বাস্থ্যসেবায় ক্ষতির ঝুঁকিতে তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
স্বাস্থ্যসেবায় অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতির চিত্র
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী প্রতি ১০ জন রোগীর মধ্যে প্রায় একজন কোনো না কোনো ধরনের ক্ষতির শিকার হন এবং এর প্রায় অর্ধেকই প্রতিরোধযোগ্য বলে বিবেচিত। এনসিডি রোগীদের ক্ষেত্রে বারবার স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের প্রয়োজন হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে এই ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। কিছু জটিল রোগে অনাকাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাজনিত ঘটনার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য।
রোগীর নিরাপত্তার ঝুঁকি শুধু ভুল ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়। রোগ নির্ণয়ে দেরি, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্যের ভুল যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা-সম্পর্কিত সংক্রমণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা ফলোআপ বাদ পড়া এবং বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও রোগীর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের বোঝা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে WHO-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশ এনসিডির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর একটি বড় অংশ অকালমৃত্যু। ফলে এনসিডি মোকাবিলায় শুধু রোগ প্রতিরোধ বা ওষুধের প্রাপ্যতা নয়, নিরাপদ ও ধারাবাহিক চিকিৎসাব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র—সব পর্যায়েই সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। একটি রোগীর চিকিৎসা যেন এক প্রতিষ্ঠানে শুরু হয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে গেলে প্রয়োজনীয় তথ্য হারিয়ে না যায়, সেটিও নিরাপদ চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ওষুধ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন
এনসিডি রোগীদের অনেকেরই দীর্ঘদিন একাধিক ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। একই রোগীর একাধিক চিকিৎসক থাকলে বা বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসা পরিবর্তন হলে কোন ওষুধ কত মাত্রায় এবং কতদিন খেতে হবে—এ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই রোগীর ব্যবহৃত সব ওষুধের তালিকা নিয়মিত পর্যালোচনা করা, নতুন ওষুধ দেওয়ার আগে আগের ওষুধ সম্পর্কে জানা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ।
রোগী ও পরিবারের সদস্যদেরও ওষুধ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। কোন ওষুধ কখন খাবেন, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে কী করবেন এবং পরবর্তী ফলোআপ কখন—এসব তথ্য রোগীকে সহজ ভাষায় জানানো নিরাপদ চিকিৎসার অংশ। WHO-ও রোগী ও পরিচর্যাকারীদের নিজেদের চিকিৎসা, ওষুধ ও সতর্কসংকেত সম্পর্কে জানার এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করার আহ্বান
WHO মনে করে, এনসিডি রোগীদের নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা-কেন্দ্রিক সমন্বিত ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে শুধু বড় হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সময়মতো রেফারেল এবং বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী, নির্ভরযোগ্য রোগীর তথ্য, চিকিৎসার মানসম্মত প্রোটোকল এবং কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ডও রোগীর তথ্য বারবার সংগ্রহের প্রয়োজন কমানো এবং চিকিৎসায় তথ্যের ভুল বা পুনরাবৃত্তি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
রোগীকেও চিকিৎসার অংশীদার করতে হবে
রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু চিকিৎসক বা হাসপাতালের নয়। রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদেরও চিকিৎসাপ্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার করা প্রয়োজন। রোগীর নিজের রোগ, ওষুধ, চিকিৎসার লক্ষ্য, সতর্কসংকেত এবং পরবর্তী ফলোআপ সম্পর্কে ধারণা থাকলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় ভুল বা বিভ্রান্তি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস ২০২৬-এর বার্তাতেও এনসিডি রোগীদের শুধু সেবাগ্রহীতা হিসেবে নয়, নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করার অংশীদার হিসেবে বিবেচনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। রোগীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যেতে পারে।
বাংলাদেশে সামনে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এনসিডি চিকিৎসার পুরো পথ—রোগ নির্ণয় থেকে দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ পর্যন্ত—নিরাপদ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য ওষুধ ব্যবস্থাপনা, সংক্রমণ প্রতিরোধ, রোগ নির্ণয়ের মান, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ, রেফারেল ব্যবস্থা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার রিপোর্টিংয়ের মতো বিষয়গুলোকে স্বাস্থ্যসেবার নিয়মিত ব্যবস্থাপনার অংশ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ ও নীতিগত কাজ হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে শুধু বড় বা তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতাল নয়, জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বেসরকারি হাসপাতাল ও বহির্বিভাগীয় চিকিৎসাকেন্দ্রেও নিরাপদ চিকিৎসার মানদণ্ড কার্যকর করা প্রয়োজন।
নিরাপদ চিকিৎসাই হতে পারে এনসিডি ব্যবস্থাপনার নতুন ভিত্তি
এনসিডি নিয়ন্ত্রণে রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং চিকিৎসার সুযোগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই চিকিৎসা যেন নিরাপদ হয়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় ছোট একটি ভুলও কখনো কখনো বড় জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই রোগীর নিরাপত্তাকে চিকিৎসার অতিরিক্ত কোনো বিষয় হিসেবে নয়, বরং এনসিডি ব্যবস্থাপনার মূল অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস ২০২৬-এর বার্তা বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। রোগী, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগে যদি নিরাপদ ও ধারাবাহিক এনসিডি চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাও বাড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), WHO South-East Asia এবং The Daily Star-এর ২০২৬ সালের বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস ও বাংলাদেশে এনসিডি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0