দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শরীরে কী প্রভাব ফেলে? বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ঘুম, হজম, হৃদ্যন্ত্র ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত স্ট্রেস কীভাবে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, জানুন।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শরীরে কী প্রভাব ফেলে?
কাজের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক সমস্যা, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা দীর্ঘদিনের কোনো উদ্বেগ—জীবনের নানা পরিস্থিতি থেকে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস তৈরি হতে পারে। অল্প সময়ের জন্য স্ট্রেস শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে এটি মানুষকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করে। কিন্তু কোনো চাপ যখন দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং শরীরের স্বাভাবিক বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ কমে যায়, তখন তা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, স্ট্রেস হলো কঠিন পরিস্থিতির কারণে তৈরি হওয়া উদ্বেগ বা মানসিক টান। অতিরিক্ত স্ট্রেস শারীরিক ও মানসিক—দুই ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। মাথাব্যথা, শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা, পেটের অস্বস্তি, ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ ও খিটখিটে মেজাজ এর সাধারণ প্রকাশগুলোর মধ্যে রয়েছে।
স্ট্রেস হলে শরীরে কী ঘটে?
কোনো পরিস্থিতিকে শরীর যখন হুমকি বা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে শনাক্ত করে, তখন মস্তিষ্কের মাধ্যমে শরীরে একটি স্বাভাবিক ‘স্ট্রেস রেসপন্স’ সক্রিয় হয়। এ সময় অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো হরমোনের মাত্রা বাড়তে পারে। হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়, রক্তচাপ বাড়ে এবং শরীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য প্রস্তুত হয়। স্বল্পমেয়াদি পরিস্থিতিতে এই প্রতিক্রিয়া সাধারণত কিছু সময় পর কমে যায়।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের স্ট্রেস চলতে থাকলে এই প্রতিক্রিয়া বারবার সক্রিয় হতে পারে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (APA) জানিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস শরীরের প্রায় সব সিস্টেমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ওপর এক ধরনের ‘wear and tear’ বা ক্ষয় তৈরি করতে পারে।
হৃদ্যন্ত্র ও রক্তচাপে প্রভাব
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। স্ট্রেসের সময় হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেড়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া সক্রিয় থাকলে উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকির সঙ্গে এর সম্পর্ক দেখা গেছে।
APA-এর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস রক্তনালির প্রদাহসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হৃদ্স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মানসিক চাপ থাকলেই কারও হৃদ্রোগ হবে। বরং দীর্ঘদিনের স্ট্রেস, ঘুমের ঘাটতি, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও ধূমপানের মতো অন্যান্য ঝুঁকি একসঙ্গে থাকলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
ঘুমের সমস্যা বাড়তে পারে
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের অন্যতম সাধারণ প্রভাব হলো ঘুমের ব্যাঘাত। অতিরিক্ত চিন্তা বা উদ্বেগের কারণে রাতে সহজে ঘুম না আসা, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া কিংবা ঘুমানোর পরও ক্লান্ত লাগতে পারে। আবার পর্যাপ্ত ঘুম না হলে পরের দিন মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
এভাবে স্ট্রেস ও ঘুমের সমস্যার মধ্যে একটি চক্র তৈরি হতে পারে—চাপের কারণে ঘুম কমে, আর ঘুমের ঘাটতি মানসিক চাপ সামলানো আরও কঠিন করে তোলে।
হজমের ওপরও প্রভাব পড়ে
মস্তিষ্ক ও পরিপাকতন্ত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। মানসিক চাপের সময় কারও পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে। কারও আবার ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
APA বলছে, স্ট্রেস মস্তিষ্ক ও অন্ত্রের যোগাযোগে পরিবর্তন আনতে পারে এবং বিশেষ করে ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS) বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অন্ত্রের সমস্যায় উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে।
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় পরিবর্তন
স্ট্রেসের সঙ্গে শরীরের হরমোন ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জটিল সম্পর্ক রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি স্ট্রেসে শরীরের কিছু প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসে এই ব্যবস্থার স্বাভাবিক ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে।
দীর্ঘদিনের স্ট্রেসের সঙ্গে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর ক্ষয় বা চাপ এবং শরীরে দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমাত্রার প্রদাহের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তাই দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসকে শুধু মানসিক সমস্যা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
মাথাব্যথা ও পেশিতে ব্যথা হতে পারে
স্ট্রেসের সময় শরীরের পেশি স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা টানটান হয়ে যায়। দীর্ঘদিন মানসিক চাপ থাকলে ঘাড়, কাঁধ ও পিঠের পেশিতে দীর্ঘস্থায়ী টান তৈরি হতে পারে। এর ফলে ঘাড়-কাঁধে ব্যথা, শরীর শক্ত লাগা কিংবা মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘসময় কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহার, কম শারীরিক নড়াচড়া এবং ভুল বসার ভঙ্গির সঙ্গে স্ট্রেস যুক্ত হলে এসব অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে।
ওজন ও খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসতে পারে
মানসিক চাপের সময় সবার প্রতিক্রিয়া একরকম হয় না। কেউ বেশি খেতে পারেন, আবার কারও ক্ষুধা কমে যেতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের কারণে অনিয়মিত খাবার, অতিরিক্ত মিষ্টি বা উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি ঝোঁক এবং শারীরিক কার্যক্রম কমে যাওয়ার মতো আচরণগত পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের পরিবর্তন দীর্ঘদিন চললে ওজন বাড়া বা কমার পাশাপাশি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। APA দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি ও বিপাকীয় সমস্যার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছে।
মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব
দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের প্রভাব সরাসরি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও পড়ে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, খিটখিটে মেজাজ, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা, সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা, মানসিক ক্লান্তি এবং কোনো কাজে আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস উদ্বেগ ও বিষণ্নতার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে স্ট্রেসের কোনো একটি লক্ষণ থাকলেই উদ্বেগ বা বিষণ্নতার রোগ নির্ণয় করা যায় না। উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
প্রতিদিনের স্বাভাবিক ব্যস্ততা থেকে সাময়িক চাপ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু স্ট্রেস যদি দীর্ঘদিন ধরে থাকে এবং কাজ, পড়াশোনা, সম্পর্ক, ঘুম বা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করতে শুরু করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
- দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা থাকা
- সবসময় অস্থিরতা বা অতিরিক্ত উদ্বেগ অনুভব করা
- মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা
- দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথা বা শরীরের ব্যথা থাকা
- খাবারের অভ্যাস বা ওজনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হওয়া
- পেটের সমস্যা বারবার ফিরে আসা
- কাজ বা স্বাভাবিক জীবনযাপনে আগ্রহ কমে যাওয়া
- দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার অনুভূতি থাকা
এসব ক্ষেত্রে নিজের মতো করে ঘুমের ওষুধ, উদ্বেগ কমানোর ওষুধ বা অন্য কোনো চিকিৎসা শুরু না করে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস কমাতে কী করবেন?
স্ট্রেসের উৎস সবসময় নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তবে শরীর ও মনের ওপর এর প্রভাব কমাতে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস সাহায্য করতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রতিদিন কিছু সময় নিজের জন্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
- প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটা বা শারীরিক ব্যায়াম করুন।
- ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি বজায় রাখুন।
- অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও তামাকজাত পণ্য এড়িয়ে চলুন।
- প্রয়োজনে গভীর শ্বাস নেওয়া, শিথিলায়ন বা মননশীলতার অনুশীলন করুন।
- কাজের চাপকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে সামলানোর চেষ্টা করুন।
- বিশ্বস্ত মানুষদের সঙ্গে নিজের অনুভূতি নিয়ে কথা বলুন।
- স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে গেলে পেশাদার সহায়তা নিন।
শেষ কথা
মানসিক চাপ জীবনের স্বাভাবিক অংশ। অল্প সময়ের স্ট্রেস অনেক ক্ষেত্রে শরীরকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করে। কিন্তু দীর্ঘদিনের বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা স্ট্রেস শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। হৃদ্যন্ত্র, ঘুম, হজম, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, পেশি এবং মানসিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাব দেখা দিতে পারে।
তাই দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রেস অনুভব করলে বিষয়টি ‘স্বাভাবিক’ বলে এড়িয়ে না গিয়ে এর কারণ বোঝা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো জীবনযাপনে পরিবর্তন এবং প্রয়োজনে পেশাদার চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0