ডেঙ্গু-হামের দ্বৈত সংক্রমণে চাপে বাংলাদেশের হাসপাতাল, বাড়ছে বেড সংকট
ডেঙ্গু ও হামের একসঙ্গে বাড়তে থাকা সংক্রমণে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে। অনেক হাসপাতালে নির্ধারিত বেডের বাইরে রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ডেঙ্গু-হামের দ্বৈত সংক্রমণে চাপে বাংলাদেশের হাসপাতাল, বাড়ছে বেড সংকট
বাংলাদেশে একই সময়ে ডেঙ্গু ও হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তি দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাবও অব্যাহত থাকায় অনেক সরকারি হাসপাতালে নির্ধারিত বেডের তুলনায় বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। কোথাও অতিরিক্ত ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে, আবার কোথাও রোগীদের মেঝে, বারান্দা ও করিডোরেও চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে।
১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত ৩৮ শয্যার একটি ওয়ার্ডে ১৪৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু ও হামের রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় সাধারণ চিকিৎসাসেবার ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
একসঙ্গে দুই সংক্রমণে বাড়ছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার চাপ
ডেঙ্গু ও হাম—দুটি রোগের প্রকৃতি আলাদা হলেও একই সময়ে বড় আকারে সংক্রমণ ঘটলে হাসপাতালের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ডেঙ্গু রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে জ্বরের পরের সংকটপূর্ণ সময়ে ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও দ্রুত চিকিৎসা দরকার হতে পারে। অন্যদিকে হাম অত্যন্ত সংক্রামক এবং শিশুদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থতা তৈরি করতে পারে। ফলে হামের রোগীদের জন্য সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও পৃথক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়।
একই হাসপাতালে যখন দুই ধরনের রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে, তখন শুধু বেডের সংখ্যাই নয়—চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আইসিইউ সুবিধা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ে। সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতিতে এসব চাপ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালেই দৃশ্যমান হয়েছে।
ঢাকায় নির্ধারিত সক্ষমতার বাইরে রোগী
ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের চিত্রে এই চাপের মাত্রা স্পষ্ট। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে মুগদা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত একটি ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ রোগী চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য পাওয়া যায়। কিছু রোগী বেড না পেয়ে প্রথমে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন। রোগীর সংখ্যা বাড়ায় ডেঙ্গু রোগীদের সাধারণ মেডিসিন ওয়ার্ডেও স্থানান্তর করা হয়েছে।
ডেঙ্গু রোগীর চাপের সঙ্গে হামের রোগীরাও একই সময়ে হাসপাতালে আসায় শিশুদের চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ডেঙ্গু ও হামের রোগী একসঙ্গে চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
ঢাকার বাইরে পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক
হাসপাতালের ওপর চাপ শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য করিডোর, বারান্দা এবং ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী জায়গাও চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করার তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু রোগী একাধিক হাসপাতালে ঘুরেও বেড পাননি বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিস্থিতিও হাসপাতাল সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপের উদাহরণ। ৫০ শয্যার ওই হাসপাতালে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ১৪৮ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন—যা অনুমোদিত শয্যাসংখ্যার প্রায় তিন গুণ। সেখানে হাম ও ডেঙ্গু রোগীদের পাশাপাশি অন্যান্য রোগীর চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংক্রামক রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষ বা বেডের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।
শিশু রোগীদের ওপর বাড়তি চাপ
হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে শিশুদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় চাপ বিশেষভাবে বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে ৪২৭ জন শিশু চিকিৎসাধীন থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়। তাদের মধ্যে হামের উপসর্গ থাকা শিশুও ছিল। একই সময়ে ডেঙ্গু রোগীরাও হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছিল।
অতিরিক্ত রোগীর কারণে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, পর্যবেক্ষণ এবং পৃথক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত শিশুদের অন্যান্য রোগীর কাছ থেকে যথাসম্ভব পৃথক রাখা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গুর চাপ দ্রুত বেড়েছে
সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতিও হাসপাতাল সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ডেঙ্গুতে ৪২ হাজার ৫৯০ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং ১১৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ওই সময়ের আগের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৫৮ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, যা তখন পর্যন্ত বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক ভর্তি ছিল। একই সময়ে দেশজুড়ে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবও হাসপাতালগুলোকে চাপে রেখেছিল।
পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুর চাপ আরও বাড়ে। ২৩ সেপ্টেম্বরের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৮৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ছয়জনের মৃত্যু হয়। একই সময়ে ১ হাজার ১৫৭ জন সন্দেহজনক হাম রোগীকেও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রোগীর চাপ সামলাতে কিছু সরকারি হাসপাতাল নির্ধারিত রোগের জন্য ব্যবহৃত নয় এমন ওয়ার্ডেও ডেঙ্গু ও হাম রোগীদের চিকিৎসা দিতে বাধ্য হয়।
হামের প্রাদুর্ভাবও এখনো বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব মার্চ ২০২৬ থেকে বড় আকার ধারণ করেছে। WHO-এর এপ্রিলের পরিস্থিতি প্রতিবেদনে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। আক্রান্তদের বড় অংশ ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আক্রান্ত শিশু টিকা নেয়নি বা টিকার পূর্ণ সুরক্ষা পায়নি।
সেপ্টেম্বরেও হামের সংক্রমণ ও হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে সরকার ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে নতুন ক্যাচ-আপ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো টিকাদান থেকে বাদ পড়া শিশুদের সুরক্ষার আওতায় আনা এবং সংক্রমণের বিস্তার কমানো।
বেড সংকটের পাশাপাশি বাড়ছে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি
বেডের ঘাটতি শুধু রোগীকে একটি শয্যা না পাওয়ার সমস্যা নয়। অতিরিক্ত রোগী থাকলে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর কাজের চাপ বাড়ে, রোগী পর্যবেক্ষণে সময় কমে যেতে পারে এবং জরুরি রোগীকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়াও কঠিন হতে পারে। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অতিরিক্ত ভিড় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া হাম রোগীদের সঙ্গে অন্যান্য রোগী একই জায়গায় চিকিৎসা নিলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে শুধু অতিরিক্ত বেড যোগ করাই যথেষ্ট নয়; রোগের ধরন অনুযায়ী পৃথকীকরণ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত জনবল এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী নিশ্চিত করাও জরুরি।
হাসপাতালের পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব
একই সময়ে ডেঙ্গু ও হামের মতো সংক্রমণ বাড়লে সব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার ওপর নির্ভর করলে হাসপাতালের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত রেফারেল, বাড়িতে নিরাপদ পর্যবেক্ষণের বিষয়ে সঠিক পরামর্শ এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে সেবা সক্ষমতা বাড়াতে পারলে কিছু রোগীর জন্য রাজধানী বা বড় শহরের হাসপাতালের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ব্যবস্থা জরুরি
ডেঙ্গু ও হাম—দুই রোগের নিয়ন্ত্রণ কৌশল আলাদা। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ গুরুত্বপূর্ণ। WHO বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য খাতের বাইরেও স্থানীয় সরকার, নগর কর্তৃপক্ষ ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
অন্যদিকে হাম নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো উচ্চ টিকাদান কভারেজ নিশ্চিত করা এবং বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা। একই সঙ্গে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে নজরদারি এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা প্রয়োজন।
দ্বৈত প্রাদুর্ভাব থেকে যে বার্তা
ডেঙ্গু ও হামের একসঙ্গে বাড়তে থাকা সংক্রমণ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক তথ্যগুলো দেখাচ্ছে, শুধু হাসপাতালের বেড বাড়ানো নয়—প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ, রেফারেল, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নিশ্চিত করার সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বিশেষ করে শিশু ও গুরুতর রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত বেড, পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর বিস্তার কমাতে মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ এবং হামের সংক্রমণ কমাতে টিকাদান কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে হাসপাতালের ওপর চাপও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যভিত্তিক সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদন, WHO Bangladesh, The Daily Star, bdnews24, TBS ও Dhaka Tribune-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0