একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন কত ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন?
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন?
ব্যস্ত জীবনযাপন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, রাত জেগে মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহার এবং অনিয়মিত দৈনন্দিন রুটিনের কারণে অনেক মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমান। কেউ মনে করেন ৫–৬ ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট, আবার কেউ ছুটির দিনে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে সারা সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থ থাকার জন্য আসলে কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিতভাবে প্রতি রাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। তবে শুধু ঘুমের সময় নয়, ঘুমের মান, নিয়মিততা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
বয়স অনুযায়ী ঘুমের প্রয়োজন কত?
সবার ঘুমের প্রয়োজন এক নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ঘুমের পরিমাণও কিছুটা পরিবর্তিত হয়। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC)-এর সুপারিশ অনুযায়ী:
- ১৮–৬০ বছর: প্রতিদিন ৭ ঘণ্টা বা তার বেশি।
- ৬১–৬৪ বছর: সাধারণত ৭–৯ ঘণ্টা।
- ৬৫ বছর বা তার বেশি: সাধারণত ৭–৮ ঘণ্টা।
তবে ব্যক্তিভেদে ঘুমের প্রয়োজন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। বয়সের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক অবস্থা, দৈনন্দিন কাজ, জীবনযাপন এবং কিছু স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি ঘুমের প্রয়োজনকে প্রভাবিত করতে পারে।
শুধু ৭ ঘণ্টা ঘুমালেই কি যথেষ্ট?
৭ ঘণ্টা হলো প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ন্যূনতম সুপারিশ; এটিকে সবার জন্য নির্দিষ্ট ও আদর্শ সংখ্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়। অনেক মানুষের ৭ ঘণ্টার চেয়ে কিছুটা বেশি ঘুম প্রয়োজন হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঘুম থেকে ওঠার পর সতেজ অনুভব করা এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব না থাকা।
American Academy of Sleep Medicine এবং Sleep Research Society-এর বিশেষজ্ঞ প্যানেল সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিতভাবে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমানোর সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, ঘুমের স্বাস্থ্য নির্ধারণে শুধু সময় নয়—ঘুমের সময়সূচি, নিয়মিততা, মান এবং ঘুমের কোনো ব্যাধি আছে কি না, সেসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত কম ঘুমালে কী হতে পারে?
এক-দুই দিন কম ঘুম হলে সাধারণত সাময়িক ক্লান্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া বা মেজাজ খারাপ হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বিষয়টি আরও গুরুতর হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী অপর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং বিষণ্নতার মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ঘুমের ঘাটতি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও দৈনন্দিন কর্মক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে গাড়ি চালানো, মেশিন পরিচালনা বা মনোযোগনির্ভর কাজের সময় ঘুমঘুম ভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই পর্যাপ্ত ঘুম শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের জন্য নয়, নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বেশি ঘুমালেই কি বেশি ভালো?
অনেকে মনে করেন, যত বেশি ঘুমানো যায় ততই স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। বিষয়টি এতটা সরল নয়। অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নিয়মিতভাবে ৭ ঘণ্টা বা তার বেশি ঘুমের সুপারিশ করা হলেও ৯ ঘণ্টার বেশি ঘুম সব মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নয়।
তবে তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক, দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি পূরণ করছেন এমন ব্যক্তি বা অসুস্থতার সময় কারও বেশি ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে। নিয়মিতভাবে অতিরিক্ত ঘুমের প্রয়োজন হচ্ছে বা দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পরও ক্লান্ত লাগছে—এমন হলে এর পেছনে কোনো স্বাস্থ্যগত কারণ আছে কি না তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।
ঘুমের মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ
শুধু বিছানায় ৭–৮ ঘণ্টা থাকা আর ৭–৮ ঘণ্টা ভালোভাবে ঘুমানো এক বিষয় নয়। বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া, দীর্ঘ সময় ঘুমাতে না পারা বা ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হলে পর্যাপ্ত সময় বিছানায় থাকার পরও শরীর প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নাও পেতে পারে।
সুস্থ ঘুমের জন্য নিয়মিত সময়সূচি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস ঘুমের নিয়মিততা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
ভালো ঘুমের জন্য কী করবেন?
- প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন।
- ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা অন্যান্য স্ক্রিন ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
- দিনের বেলায় নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম করুন।
- সকালে বা দিনের শুরুতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো নেওয়ার চেষ্টা করুন।
- ঘুমের পরিবেশ শান্ত, আরামদায়ক ও অন্ধকার রাখুন।
- ঘুমের কাছাকাছি সময়ে অতিরিক্ত ভারী খাবার বা উত্তেজক পানীয় গ্রহণ এড়িয়ে চলুন।
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত সময় ঘুমের জন্য নির্ধারণ করুন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন?
পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যদি নিয়মিত ঘুমাতে সমস্যা হয়, রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়, দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পায় বা ঘুম থেকে ওঠার পরও সবসময় ক্লান্ত লাগে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
বিশেষ করে ঘুমের সময় জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা বা হাঁসফাঁস করার মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এসব লক্ষণ কিছু ক্ষেত্রে স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো ঘুমের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ঘুমকে বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন হিসেবে দেখুন
কাজের চাপ বা ব্যস্ততার কারণে ঘুমের সময় কমিয়ে দেওয়া অনেকের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু ঘুম শরীরের একটি মৌলিক জৈবিক প্রয়োজন। ঘুমের সময় শরীর বিশ্রাম নেয়, মস্তিষ্কের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং পরবর্তী দিনের শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতার জন্য শরীর প্রস্তুত হয়।
তাই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তবে শুধু ঘুমের ঘণ্টা গোনা নয়—নিয়মিত সময়সূচি, ভালো ঘুমের পরিবেশ এবং মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, সবার ঘুমের প্রয়োজন এক নয়। বয়স ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজন কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। তবে নিয়মিতভাবে ৭ ঘণ্টার কম ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে সেটিকে স্বাভাবিক ধরে না নিয়ে নিজের ঘুমের রুটিন ও স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
পছন্দ
0
অপছন্দ
0
ভালোবাসা
0
মজার
0
রাগান্বিত
0
দুঃখিত
0
ওয়াউ
0